
মিয়ানমার সরকারের সামরিক অভিযানের মুখে দেশত্যাগের ৯ বছর পূর্ণ হওয়ায় বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী নিজ মাতৃভূমিতে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দাবিতে সমাবেশ করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন শিবিরে আয়োজিত এই সমাবেশে রোহিঙ্গারা রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান। দিনটিকে তারা ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবস’-এর নবম বার্ষিকী হিসেবে পালন করেন।
বর্তমানে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন অস্থায়ী শিবিরে মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রায় ১২ লাখের বেশি শরণার্থী বসবাস করছেন। ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নির্মম অভিযানের পর জীবন বাঁচাতে তারা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে গণহারে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন। এর আগে আগের বিভিন্ন দাঙ্গার কারণে আরো তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে বসবাস করে আসছিল।
এদিকে বাংলাদেশ সরকার অন্তত দুবার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করার চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি। রাখাইন রাজ্যে উপযুক্ত নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার পরিবেশ না থাকায় কোনো শরণার্থীই স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে রাজি হননি। তবে বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে যে, কাউকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হবে না।
শরণার্থী নেতা সৈয়দ উল্লাহ সমাবেশে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মিয়ানমার সামরিক বাহিনী কিংবা আরাকান আর্মি—উভয় পক্ষই যতদিন এই দ্বিমুখী খেলা চালিয়ে যাবে, ততদিন রাখাইনের পরিস্থিতি নিরাপদ হবে না। এর মানে কি এই যে আমাদের আরো ৫০ বছর এখানেই কাটিয়ে দিতে হবে?’ তিনি আরো বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শান্তির পরিবেশ কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেটি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলকে ভাবতে হবে।
১৫ দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ বিবৃতি :
রোহিঙ্গা দিবসের দিনটিতে বাংলাদেশে অবস্থিত ১৫টি দেশের কূটনৈতিক মিশন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এক যৌথ বিবৃতিতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য অব্যাহত আন্তর্জাতিক সহায়তার দাবি জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন এবং গত প্রায় এক দশক ধরে তাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশ ও এর জনগণ প্রশংসার দাবিদার। কানাডা, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, জাপান, কসোভো, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্য এই যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছে।
বিবৃতিতে রাখাইন রাজ্যের চলমান সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, বিমান হামলা, মানবিক সহায়তার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং ক্রমবর্ধমান সংঘাত পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে রাখাইন রাজ্যে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি বলে জানায় কূটনৈতিক মিশনগুলো।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের এই সামরিক অভিযানের সময় সংঘটিত গণহত্যা, নির্বিচারে হত্যা এবং পদ্ধতিগত যৌন সহিংসতার অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) বিচার প্রক্রিয়া চলছে। জাতিসংঘের মতে, ওই অভিযানের মাত্রা ও নৃশংসতা জাতিগত নির্মূল ও গণহত্যার শামিল। অন্যদিকে, মিয়ানমার শুরু থেকেই দাবি করে আসছে যে তাদের অভিযানটি ছিল একটি বৈধ সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ।
চলতি মাসের শুরুতে মিয়ানমারের সামরিক সমর্থিত সরকার জানায় যে, বাংলাদেশের ক্যাম্পে থাকা তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত হলে তারা তাদের ফিরিয়ে নেবে। তবে মিয়ানমার সরকার বরাবরই ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় অস্বীকার করে তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে, যা তাদের নিজস্ব পরিচয় মুছে ফেলার চক্রান্ত বলে মনে করছে বাংলাদেশ।