
উন্নত জীবন ও নিরাপত্তার আশায় ঝুঁকিপূর্ণ পথে অভিবাসনের চেষ্টা করতে গিয়ে গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে অন্তত ৪ হাজার ৪১৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এসব মৃত্যুর তথ্য নথিবদ্ধ করেছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)। তবে তথ্যের ঘাটতির কারণে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
আইওএমের মিসিং মাইগ্র্যান্টস প্রজেক্টের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক ডেটা অ্যালায়েন্স ফর চিলড্রেন অন দ্য মুভের (আইডিএসি) সহায়তায় তৈরি প্রতিবেদনটিতে অভিবাসনপথে শিশুদের মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা সঠিকভাবে নথিবদ্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই সময়ে বিশ্বজুড়ে অভিবাসনযাত্রায় প্রায় ৮১ হাজার মানুষের মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪ হাজার ৮৬২টি ঘটনায় মৃত বা নিখোঁজ ব্যক্তির বয়স কিংবা বয়সভিত্তিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। মোট ঘটনার ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশের ক্ষেত্রে বয়সের তথ্য না থাকায় এসব ঘটনার মধ্যে কত শিশু রয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব হয়নি।
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভূমধ্যসাগরীয় পথ
অভিবাসনের বিভিন্ন রুটের মধ্যে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার পথটি অন্যতম প্রাণঘাতী। বিশেষ করে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুটে শিশুদের মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে আইওএম।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুট দিয়ে ইতালি ও মাল্টায় পৌঁছানো অভিবাসীদের ১৯ শতাংশ ছিল শিশু। অথচ ওই রুটে নথিবদ্ধ মোট মৃত্যুর মাত্র ২ শতাংশ শিশুর মৃত্যু হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই ব্যবধান থেকে ধারণা করা যায়, অনেক শিশুর মৃত্যু ঘটলেও তাদের বয়স শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না অথবা ঘটনাগুলো নথির বাইরে থেকে যাচ্ছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্ত, লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন পথ, সাহারা মরুভূমি এবং হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলেও ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনযাত্রায় শিশুদের প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। সমুদ্রপথে নৌকাডুবি, মরুভূমির তীব্র গরম, পানিশূন্যতা, অনাহার এবং মানব পাচারকারীদের সহিংসতা এসব মৃত্যুর অন্যতম ঝুঁকি।
বয়স ও পরিচয় শনাক্তে বড় বাধা
আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, অভিবাসনপথে মৃত্যুর ঘটনা নথিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে বয়স ও পরিচয় শনাক্ত করা বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। আবার মরদেহ উদ্ধার হলেও মৃত ব্যক্তির পরিচয় বা বয়স নিশ্চিত করা যায় না।
ফলে অভিবাসনযাত্রায় প্রাণ হারানো শিশুদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সমুদ্রপথে নৌকাডুবি বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় যাত্রীদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য না থাকায় অনেক শিশুর মৃত্যুর হিসাব নথিতে যুক্ত হচ্ছে না।
আইওএমের ডেটা, ইনসাইট অ্যান্ড পলিসি বিভাগের প্রধান স্টুয়ার্ট ক্যাম্পো বলেন, অভিবাসনযাত্রায় প্রাণ হারানো প্রতিটি শিশুর মৃত্যুর হিসাব পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু তথ্যের অভাবে অনেক শিশুর মৃত্যু নথিতে স্থান পাচ্ছে না।
নিরাপদ অভিবাসনপথ তৈরির আহ্বান
আইওএম বলছে, নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের সুযোগের অভাব মানুষকে বিপজ্জনক পথে যাত্রা করতে বাধ্য করছে। এর ফলে শিশুরাও সমুদ্রপথ, মরুভূমি এবং মানব পাচারকারী চক্রের কারণে প্রাণঘাতী ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
প্রতিবেদনে বিশ্বনেতাদের প্রতি অভিবাসনপথে মৃত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের বয়স এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে নথিবদ্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়ানো, উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করা এবং মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটির মতে, অভিবাসনপথে শিশুদের মৃত্যু প্রতিরোধে নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানো এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম), মিসিং মাইগ্র্যান্টস প্রজেক্ট এবং আন্তর্জাতিক ডেটা অ্যালায়েন্স ফর চিলড্রেন অন দ্য মুভের সহায়তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন।