ঢাকাসোমবার , ১৯ অক্টোবর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

এল নিনোর খরায় ইন্দোনেশিয়ায় পাম চাষিদের দুর্দশা, শুকিয়ে যাচ্ছে নদীপথ

প্রতিবেদক
বিপ্লব হোসাইন
১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৯ বিকাল

Link Copied!

ইন্দোনেশিয়ায় এল নিনোর প্রভাবে দীর্ঘস্থায়ী খরায় নদীর পানির স্তর কমে যাওয়ায় পাম তেল পরিবহনে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। দেশটির পশ্চিম কালিমান্তান প্রদেশের প্রধান পরিবহন পথ কাপুয়াস নদীতে পানি কমে যাওয়ায় আটকে পড়েছে মালবাহী নৌযান। ফলে পাম তেল কারখানাগুলো উৎপাদিত তেল সরবরাহ করতে পারছে না। মজুদ ট্যাংক পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় কমিয়ে দিয়েছে পাম ফল কেনাও। এতে বিপাকে পড়েছেন হাজারো ক্ষুদ্র পাম চাষি।

রয়টার্সের ১৯ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিম কালিমান্তানের সাঙ্গাউ অঞ্চলের ৩৩ বছর বয়সী পাম চাষি সুপেন্দি অক্টোবরের শুরুতে নিজের ও প্রতিবেশীদের খামার থেকে সংগ্রহ করা সাত মেট্রিক টন পাম ফল বিক্রি করতে একটি কারখানায় যান। সেখানে চার দিন অপেক্ষা করেও ফল বিক্রি করতে পারেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত কারখানায় জায়গা না থাকায় তাকে ফল নিয়ে ফিরে যেতে বলা হয়।

সুপেন্দি রয়টার্সকে বলেন, ‘আমার ফলগুলো নেওয়া হয়নি। এখন আমরা বুঝে উঠতে পারছি না, এগুলো কীভাবে বিক্রি করব।’ তার মতো পশ্চিম কালিমান্তানের হাজারো ক্ষুদ্র চাষি উৎপাদিত পাম ফল বিক্রি করতে না পেরে আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

শুকিয়ে যাচ্ছে কাপুয়াস নদী
ইন্দোনেশিয়ার দীর্ঘতম নদী কাপুয়াসের দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ১৪৩ কিলোমিটার। পশ্চিম কালিমান্তানের মোট পাম তেল উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ এই নদীপথে পরিবহন করা হয়। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী খরায় নদীর পানির স্তর নেমে যাওয়ায় বিভিন্ন স্থানে বালুচর জেগে উঠেছে। এতে বেশ কয়েকটি মালবাহী বার্জ ও টাগবোট আটকে পড়েছে।

পাম তেল পরিবহনে সড়কপথ ব্যবহার করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বার্জের তুলনায় ট্রাকে অনেক কম পণ্য বহন করা যায়। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ট্রাকও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কারখানাগুলোতে উৎপাদিত তেল জমে থাকছে এবং নতুন করে পাম ফল কেনার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, ২০১৫ ও ২০১৮ সালের এল নিনোর সময়ও এ ধরনের খরা দেখা দিয়েছিল। তবে এবার কাপুয়াস নদীর পানির স্তর আরও নিচে নেমেছে এবং প্রায় দুই মাস ধরে পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে।

উৎপাদন ও সরবরাহ কমার আশঙ্কা
বিশ্বের বৃহত্তম পাম তেল উৎপাদনকারী দেশ ইন্দোনেশিয়ার মোট উৎপাদনের প্রায় ১১ শতাংশ আসে পশ্চিম কালিমান্তান থেকে। কিন্তু পরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে প্রদেশটির পাম তেল সরবরাহ কমে যাচ্ছে।

ইন্দোনেশিয়ার পাম অয়েল অ্যাসোসিয়েশন (জিএপিকেআই বা GAPKI)-এর পশ্চিম কালিমান্তান শাখার প্রধান আরিস সুপ্রাথম্যানের ধারণা, আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে প্রদেশটি থেকে পাম তেলের সরবরাহ প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে।

তিনি জানান, পশ্চিম কালিমান্তানের ৫০টি পাম তেল কারখানার মধ্যে ১৩টি পরিবহন সমস্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব কারখানার প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা প্রদেশটির মোট সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক।

আরিস সুপ্রাথম্যান বলেন, পরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে পণ্য পাঠাতে দেরি হচ্ছে। গুদামের ট্যাংক পূর্ণ হয়ে গেলে উৎপাদন সীমিত করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

শুষ্ক আবহাওয়ায় পাম ফল পরিপক্ব হতে দেরি হওয়ায় জিএপিকেআই ২০২৬ সালের জন্য ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় পাম তেল উৎপাদনের পূর্বাভাসও ২ দশমিক ৯ শতাংশ কমিয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এল নিনোর প্রভাবে বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও অঞ্চলে পাম তেল উৎপাদন ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

কারখানায় ফল কেনা কমেছে দুই-তৃতীয়াংশ
সাঙ্গাউয়ের মাল্টি প্রিমা এনতাকাই পাম অয়েল মিলের ব্যবস্থাপক দিয়ান কুরনিয়াওয়ান জানান, পরিবহন সংকটের কারণে তাদের কারখানায় পাম ফল কেনার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে কারখানাটিতে ৩০ হাজার টন পাম ফল প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছিল। সেপ্টেম্বরে সেই পরিমাণ কমে ১০ হাজার টনে নেমে আসে, যা জুলাইয়ের তুলনায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কম।

১ অক্টোবর পর্যন্ত কারখানাটিতে ৮ হাজার ২০০ টন অপরিশোধিত পাম তেল মজুদ ছিল। অথচ তাদের স্টোরেজ ট্যাংকের ধারণক্ষমতা ৮ হাজার ৫০০ টন। অর্থাৎ ট্যাংক প্রায় পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় নতুন তেল সংরক্ষণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।

দিয়ান কুরনিয়াওয়ান বলেন, সাধারণত চার দিনে দুই হাজার টন পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হলেও ট্রাকে করে অনেক সময় দিনে মাত্র ১০০ টন পাঠানো যাচ্ছে। বার্জের তুলনায় ট্রাকে পরিবহন শুধু ধীরগতির নয়, খরচও প্রায় তিন গুণ বেশি।

আয় কমায় সার ব্যবহার কমাচ্ছেন কৃষকরা
পাম ফল বিক্রি করতে না পারায় ক্ষুদ্র চাষিরা শুধু তাৎক্ষণিক আয় হারাচ্ছেন না, খামারের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও সমস্যায় পড়ছেন। ক্ষুদ্র পাম চাষিদের সংগঠন এপকাসিন্ডো (APKASINDO)-এর পশ্চিম কালিমান্তান শাখার প্রধান ইন্দ্র রুস্তান্দি জানান, আয় কমে যাওয়ায় অনেক কৃষক খরচ কমাতে সার ব্যবহারের পরিমাণ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছেন।

এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে পাম গাছের পরিচর্যা ও উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সাঙ্গাউ অঞ্চলের ৬৩ বছর বয়সী ক্ষুদ্র চাষি রহমত উইয়োনো জানান, গত দুই মাস ধরে ফসল বিক্রি করতে তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কখনো কখনো ছয় ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে অন্য এলাকায় যেতে হচ্ছে তাকে। সেখানে প্রতি কেজি পাম ফলের দাম পাওয়া যাচ্ছে ২ হাজার ৬৫০ রুপি। অথচ নিজের নিয়মিত কারখানায় প্রতি কেজির দাম পেতেন ৩ হাজার ৪০০ রুপি। নিয়মিত কারখানায় পৌঁছাতে তার সময় লাগত মাত্র তিন ঘণ্টা।

রহমত বলেন, তার পরিচিত অনেক চাষি গত দুই মাসে উৎপাদিত ফল বিক্রি করতে পারেননি। দৈনন্দিন খরচ চালাতে তাদের কেউ কেউ বাড়িতে তৈরি কেক ও ডোনাট বিক্রির মতো বিকল্প কাজ বেছে নিয়েছেন।

বর্ষা দেরিতে শুরু হলে বাড়বে সংকট
ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্ষাকাল শুরু হতে অক্টোবরের পরিবর্তে নভেম্বর পর্যন্ত দেরি হতে পারে। এতে নদীতে পানির প্রবাহ স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে। একই সঙ্গে খরার কারণে ছড়িয়ে পড়া দাবানল নিয়ন্ত্রণ ও ধোঁয়াশা পরিস্থিতির উন্নতিও বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এল নিনোর প্রভাবে ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন নদী ও কূপের পানির স্তর কমে যাওয়ার পাশাপাশি বোর্নিও ও সুমাত্রায় দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। এসব দাবানলের ধোঁয়া মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দীর্ঘস্থায়ী খরা, নৌপথে পরিবহন সংকট, কারখানায় তেলের মজুদ বৃদ্ধি এবং পাম ফলের দাম কমে যাওয়ার সম্মিলিত প্রভাবে পশ্চিম কালিমান্তানের পাম তেল খাত চাপে পড়েছে। বর্ষা দেরিতে শুরু হলে এই সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে, যার সবচেয়ে বড় চাপ পড়বে ক্ষুদ্র পাম চাষিদের ওপর।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

দেশব্যাপী হাতি জরিপ পরিচালনা করবে অরণ্যক ফাউন্ডেশন

বিশ্বের সেরা নতুন ভবনের স্বীকৃতি পেল রংপুরের ‘গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি’

আম-লিচু বাগানে প্রথমবারের মতো মিলল নতুন প্রজাতির ঝিঁঝিঁ পোকা

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণে দেশের রোল মডেল হতে পারে বরিশাল

পাট খাতে চীনের প্রযুক্তি ও গবেষণা সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ

Xiaomi Launches Xiaomi TV S Pro Mini LED and Xiaomi TV X Mini LED Series in Bangladesh

বাংলাদেশে শাওমি টিভি এস প্রো মিনি এলইডি ও শাওমি টিভি এক্স মিনি এলইডি নিয়ে এলো শাওমি

স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসার শনাক্তে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করছে সরকার

তৃণমূল পর্যায়ে স্তন ক্যান্সার শনাক্তে স্ক্রিনিং চালুর উদ্যোগ সরকারের

হামের উপসর্গে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু, নতুন রোগী ১,২৫৪

সিলেটে হামের উপসর্গে আরও ২ শিশুর মৃত্যু, মোট ১৯৫

সোনাইমুড়ীতে ট্রলির চাপায় মাদরাসাছাত্রের মৃত্যু