ঢাকাবুধবার , ৪ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

সমান কাজে অসম মজুরি: চরের নারীদের জীবনযুদ্ধ

প্রতিবেদক
মুন্সী এনায়েত
২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৩:২৩ বিকাল

Link Copied!

প্রতিবছর বাংলাদেশে পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্রসহ অসংখ্য নদীর করালগ্রাসে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বাড়ি সরিয়ে নেওয়ার সময় নতুন করে ভিটা বাঁধতে হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নদীভাঙনের ভয়াবহতা বেড়েছে বহুগুণ। নদীভাঙনে বাস্তুহারা মানুষের বড় একটি অংশ রাজধানীমুখী হয়ে বস্তিবাসীতে পরিণত হচ্ছেন। আবার অনেকে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় বসতি গড়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।

নতুন চরে যখন দলবদ্ধভাবে গ্রাম ছাড়েন মানুষ, তখন সবাই মিলে ড্রেজার কিংবা ভেকু দিয়ে মাটি কেটে ভিটা বাঁধতে পারেন। কিন্তু অধিকাংশ সময় একটি একটি পরিবারকে আলাদাভাবে গ্রাম ছাড়তে হয়। তখন নতুন করে বাঁধা ভিটা ও ঘরের মেঝে তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মাটি নারীরাই কাঁখে করে বহন করেন।

২০২৪ সালের জানুয়ারি মাস। সাধারণত এ সময় নদীভাঙন খুব একটা দেখা যায় না। অথচ ফরিদপুরের চরভদ্রাসনের একাংশে তখন নদীভাঙনে দিকবিদিক হারাচ্ছেন কল্যাণপুর চরের মানুষ। সবুজ ভুট্টাক্ষেতের ভেতর দিয়ে এক নারী ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন। দুর্গম চরে একমাত্র যানবাহন ঘোড়ার গাড়ি হলেও এর আগে কোনো নারীকে ঘোড়ার গাড়ি চালাতে দেখিনি।

কাছে গিয়ে পরিচিত হলাম। নাম হাসিনা বেগম। তাঁর ঘোড়ার গাড়িতে বাড়ির সব আসবাবপত্র। এক সন্তান কোলে, আরেক সন্তানকে খড়ের ওপর বসিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন তিনি। দৃশ্যটি দেখে তাঁর সঙ্গে কথা বলার প্রবল কৌতূহল হলো।

হাসিনা বেগম জানালেন, নতুন ভিটা তিনি ও তাঁর মা মিলে বাঁধেছেন। এ সময় তাঁর স্বামী আনসার উদ্দিন নদীতে মাছ ধরতে ব্যস্ত ছিলেন। স্বামীকে বাড়িতে আসতে বলেননি হাসিনা বেগম। কারণ, মাছ বিক্রির টাকা দিয়ে টিন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় মালামাল কিনে ঘর তুলবেন তিনি।

কথায় কথায় হাসিনা বেগম আরও জানালেন, প্রতিদিনই ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে তিনি ঘাস কাটতে যান। তাঁর মতো আরও অনেক নারীও একই কাজ করেন। সংসার চালানো, সন্তানদের দেখাশোনা আর ঘর তৈরির পাশাপাশি জীবিকার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হয় তাঁদের।

নারীদের এমন সাহসিকতা, পরিশ্রম এবং মিলেমিশে সংসার সাজানোর দৃশ্য আমাকে যেমন মনে করিয়ে দিয়েছে—নারী কোনোভাবেই দুর্বল নন; তেমনি গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে শালেপুর চরের রিনা বেগম, শিল্পী আক্তার ও গেদি খাতুনের কথা শুনে। তাঁদের মতো আরও অসংখ্য নারী প্রতিনিয়ত পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।

কল্যাণপুর চর ঘুরে পরদিন গেলাম শালেপুর চর দেখতে। সেখানে একটি তিলের জমিতে নিড়ানি দিচ্ছিলেন তিনজন নারী। দূর থেকেই জানতে চাইলাম, ছবি তুলতে তাঁদের কোনো আপত্তি আছে কি না। তাঁরা সম্মতি জানালে কাছে গেলাম।

কথা বলতেই তিনজন একসঙ্গে জানালেন, জীবিকার প্রয়োজনে মাঠে কাজে এলেও মানুষের ঠাট্টা-টিটকারি তাঁদের নিত্যসঙ্গী। তাঁদের কণ্ঠে ছিল ক্ষোভ, অভিমান আর বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস।

তাঁরা জানালেন, একজন পুরুষ শ্রমিক যেখানে দৈনিক ৭০০ টাকা মজুরি পান, সেখানে একই ধরনের কাজ করেও নারীরা পান মাত্র ৪০০ টাকা। অথচ তাঁদের প্রত্যেকেরই সন্তান ও নাতি-নাতনিদের লেখাপড়ার খরচসহ সংসারের যাবতীয় ব্যয় এই সামান্য আয়ের ওপর নির্ভরশীল।

মানবিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধাও তাঁদের নাগালের বাইরে। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে উন্নয়নের ছিটেফোঁটাও যেন পৌঁছায়নি শালেপুরসহ দেশের অনেক চরাঞ্চলে। অথচ এসব চরাঞ্চলে বসবাস করেন প্রায় এক কোটি মানুষ।

চরের নারীদের জীবন কেবল মাঠের শ্রমে সীমাবদ্ধ নয়। পুরুষেরা কাজে বের হওয়ার আগে ভোরে নারীরাই রান্না করে দেন। কখনো সকালে নাস্তা নিয়ে মাঠেও যেতে হয় তাঁদের। অথচ তাঁদের দিন শুরু হয় ভোর ৪টায়। ঘুম থেকে উঠে রান্না, ঘরের কাজ, সন্তান ও পরিবারের দেখাশোনা—সবকিছু শেষ করে তাঁরা ছুটে যান মাঠে। সারাদিন কঠোর পরিশ্রম শেষে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আবার রান্না করতে হয়।

এই নারীদের পরিশ্রম নিয়ে কোনো ডর নেই। রোদ-বৃষ্টি, কাদা-মাটি কিংবা নদীভাঙন—কোনো কিছুই তাঁদের থামাতে পারে না। তাঁদের চাওয়া খুব বেশি নয়।

তাঁরা চান তাঁদের শ্রমের সম্মানী ঠিকঠাক হোক। চান কাজের মর্যাদা। চান সমঅধিকার।

তাঁদের কথায় যেন একই দাবি প্রতিধ্বনিত হয়—

“খাটতে আমাদের ডর নাই, আমরা চাই আমাদের মজুরিটা ঠিকঠাক হোক।”

লেখক: মুন্সী এনায়েত হোসেন

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

নওগাঁয় ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে ব্যাংক কর্মচারীর মৃত্যু

সপ্তাহজুড়ে কেমন থাকবে দেশের আবহাওয়া? জানাল অধিদপ্তর

স্তনবৃন্তে স্পর্শ করলেই কেন হঠাৎ মন খারাপ, কী এই ‘স্যাড নিপল সিনড্রোম’?

upay Rewards Three Distributor Partners with Umrah Packages under ‘Shopner Umrah 2026’ Campaign

উপায়ের ‘স্বপ্নের ওমরাহ’ ক্যাম্পেইনে পুরস্কার পেলেন ৩ ডিস্ট্রিবিউশন পার্টনার

সাতক্ষীরায় ৭৫ শতাংশ জলবায়ু বাস্তুচ্যুত পরিবার তীব্র খাদ্য সংকটে

মিরপুর বেড়িবাঁধে বাস-অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত ৪

হাসপাতাল নেই ৬০ গ্রামে, অসুস্থ হলে আট ঘণ্টার নদীপথ পাড়ি

চাঁদপুরে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহারে ৬ যানবাহনকে জরিমানা

ঢাকায় শুষ্ক আবহাওয়া, কমতে পারে দিনের তাপমাত্রা

বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু রক্ষায় ১২ সংস্থার সঙ্গে ইউএনডিপির চুক্তি

সড়ক দুর্ঘটনার আচরণগত ঝুঁকি নিরসনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাথে মতবিনিময় সভা