
একুশ শতকের অন্যতম বড় বৈশ্বিক সংকট জলবায়ু পরিবর্তন। ক্রমবর্ধমান গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে, দীর্ঘায়িত হচ্ছে তাপপ্রবাহ এবং ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে চরম আবহাওয়া। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এল নিনোর মতো প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। সব মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধরনে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু-ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশও এর অন্যতম বড় ভুক্তভোগী।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (WMO) সর্বশেষ Global Annual to Decadal Climate Update 2026-2035 অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত একটি বছরে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা শিল্প-পূর্ব ১৮৫০-১৯০০ সময়ের গড়ের চেয়ে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা ৯১ শতাংশ। অর্থাৎ সামনের বছরগুলোতেও পৃথিবীতে অতিরিক্ত তাপ, তীব্র তাপপ্রবাহ, ভারী বৃষ্টিপাত, খরা ও অন্যান্য চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
এরই মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। WMO-এর State of the Global Climate 2025 প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০২৫-এই ১১ বছরই রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ ১১ বছর। ২০২৫ সাল ছিল রেকর্ডের দ্বিতীয় বা তৃতীয় উষ্ণতম বছর এবং শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রায় ১.৪৩°C বেশি ছিল।

বাংলাদেশেও বাড়ছে তাপপ্রবাহ
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে দৃশ্যমান হচ্ছে তাপমাত্রা ও তাপপ্রবাহের পরিবর্তনে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য ও গবেষণায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের প্রবণতা উঠে এসেছে। ২০২৫ সালেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৪০°C-এর বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে।

অপরিকল্পিত নগরায়ণ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। কংক্রিটের স্থাপনা বৃদ্ধি, জলাশয় ও সবুজ এলাকা কমে যাওয়া এবং যানবাহন ও জ্বালানির ব্যবহার বাড়ার ফলে শহরগুলোতে আরবান হিট আইল্যান্ড প্রভাব তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকায় দিনের পাশাপাশি রাতের তাপমাত্রাও তুলনামূলক বেশি থাকায় নগরবাসীর ওপর দীর্ঘস্থায়ী তাপের চাপ তৈরি হচ্ছে।

এল নিনোর নতুন অভিঘাত
এদিকে প্রশান্ত মহাসাগরের বিষুবীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র এল নিনো বর্তমানে শক্তিশালী হচ্ছে। NOAA-এর ১৩ আগস্ট ২০২৬-এর সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শরৎ ও শীতে খুব শক্তিশালী এল নিনো হওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশের বেশি। অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী এল নিনো হওয়ার সম্ভাবনাও উল্লেখযোগ্য।
এল নিনোর প্রভাব অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে। কোথাও বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে, আবার কোথাও খরা ও স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তনের ঝুঁকি রয়েছে। তবে এল নিনোর কারণে বাংলাদেশে নির্দিষ্টভাবে কী ধরনের বৃষ্টিপাত হবে-তা এককভাবে নির্ধারণ করা যায় না; অন্যান্য বায়ুমণ্ডলীয় ও সমুদ্রীয় পরিস্থিতিও এর ওপর প্রভাব ফেলে।

অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা
তাপমাত্রা বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের কর্মক্ষমতা ও জাতীয় অর্থনীতিতে। কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন, ইটভাটা এবং অন্যান্য খাতে বাইরে কাজ করা শ্রমিকরা তীব্র তাপের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। অতিরিক্ত গরমে কর্মঘণ্টা কমে যায়, শারীরিক অসুস্থতা বাড়ে এবং উৎপাদনশীলতা কমে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর আর্থিক ক্ষতির একটি সাম্প্রতিক চিত্র তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির ২০২৫ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তাপ-সম্পর্কিত শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে বাংলাদেশে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। এতে অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে সর্বোচ্চ প্রায় ১.৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ওই বছরের জিডিপির প্রায় ০.৪ শতাংশ।
অর্থাৎ তাপপ্রবাহ এখন শুধু আবহাওয়াজনিত দুর্ভোগ নয়; এটি কর্মসংস্থান, আয়, উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করছে।

বাড়ছে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি
অতিরিক্ত তাপ মানুষের শরীরে পানিশূন্যতা, হিট ক্র্যাম্প, হিট এক্সহউশন এবং গুরুতর ক্ষেত্রে হিট স্ট্রোক তৈরি করতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী তাপের প্রভাবে হৃদ্রোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, কিডনি সমস্যা ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, দীর্ঘ সময় ধরে বেশি দিনের ও রাতের তাপমাত্রা শরীরে ক্রমাগত শারীরবৃত্তীয় চাপ সৃষ্টি করে এবং বিদ্যমান বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশেও এর প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অতিরিক্ত তাপের সঙ্গে ডায়রিয়া, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, তাপজনিত ক্লান্তি, বিষণ্নতা ও উদ্বেগের মতো স্বাস্থ্য সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে।
শিশু, বয়স্ক মানুষ, বাইরে কাজ করা শ্রমিক এবং শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিরা তাপজনিত অসুস্থতার ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তাই তাপপ্রবাহের সময় পর্যাপ্ত পানি পান, সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা, কর্মক্ষেত্রে বিশ্রামের সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

কৃষিতে বাড়ছে চাপ
বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও তাপমাত্রা বৃদ্ধি বড় হুমকি। বিশেষ করে ধানের মতো ফসলের ফুল ফোটার সময় অতিরিক্ত তাপমাত্রা পরাগায়ন ও শস্যের গঠন ব্যাহত করতে পারে। FAO-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ধানের ফুল ফোটার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অল্প সময়ের অতিরিক্ত তাপও শস্যের বন্ধ্যাত্ব বা grain sterility বাড়াতে পারে।
উষ্ণ রাতও কৃষির জন্য উদ্বেগের কারণ। গবেষণায় ধানের ফলনের সঙ্গে রাতের তাপমাত্রা বৃদ্ধির নেতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে পানির সংকট যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। অতিরিক্ত সেচনির্ভরতা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ায়। অন্যদিকে উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার কারণে কৃষিজমির উৎপাদনশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
শুধু ফসল নয়, মাছ ও প্রাণিসম্পদও তাপের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অতিরিক্ত তাপে জলাশয়ে পানির গুণগত পরিবর্তন ও অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হলে মাছের উৎপাদন কমতে পারে। একইভাবে গবাদিপশুর heat stress দুধ ও মাংস উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কী করতে হবে
জলবায়ু পরিবর্তনের এই বহুমাত্রিক প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য অভিযোজন ও প্রশমন-দুই ধরনের পদক্ষেপই জরুরি।
প্রথমত, কৃষিতে তাপ ও খরা সহনশীল জাতের উন্নয়ন ও দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে। পানি সাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা, বিশেষ করে ধান চাষে Alternate Wetting and Drying (AWD)-এর মতো প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শহরগুলোতে জলাশয় ও সবুজ এলাকা সংরক্ষণ করতে হবে। বৃক্ষরোপণ, ছাদবাগান, সবুজ করিডর এবং পর্যাপ্ত খোলা জায়গা তৈরির মাধ্যমে আরবান হিট আইল্যান্ডের প্রভাব কমানোর উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, তাপপ্রবাহের সময় শ্রমিকদের সুরক্ষায় কর্মঘণ্টা পুনর্বিন্যাস, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ছায়া ও পানি সরবরাহ এবং তাপজনিত অসুস্থতার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কর্মক্ষেত্রে তাপজনিত ঝুঁকি ও উৎপাদনশীলতা হ্রাসের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
সবশেষে, তাপপ্রবাহ ও অন্যান্য চরম আবহাওয়ার জন্য আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। স্বাস্থ্য, কৃষি, শ্রম, পানি ও নগর পরিকল্পনাকে আলাদা না দেখে সমন্বিতভাবে জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, কৃষি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এর সঙ্গে ২০২৬ সালে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনোর মতো প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও নজরদারি ও প্রস্তুতির দাবি রাখে। NOAA-এর সর্বশেষ পূর্বাভাসে শক্তিশালী এল নিনোর সম্ভাবনা এবং WMO-এর ১.৫°C সীমা অতিক্রমের উচ্চ সম্ভাবনা-দুটিই সামনে থাকা ঝুঁকির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
তাই বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো-তাপপ্রবাহ মোকাবিলা, কৃষির অভিযোজন, পানি ব্যবস্থাপনা, নগর সবুজায়ন ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে একই জলবায়ু কৌশলের অংশ করা। কারণ উষ্ণ পৃথিবীতে টিকে থাকার লড়াইটি শুধু পরিবেশ রক্ষার নয়; এটি মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখার লড়াইও।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO), আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO), বিশ্বব্যাংক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)।