ঢাকাসোমবার , ২ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

যে রক্তাক্ত আন্দোলন থেকে ‘মহান শিক্ষা দিবসের’ জন্ম

প্রতিবেদক
বিপ্লব হোসাইন
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:২৪ বিকাল

Link Copied!

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৭ সেপ্টেম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় দিন। ১৯৬২ সালের এই দিনে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের প্রণীত শিক্ষানীতির বিভিন্ন দিকের প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছিল পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ। শিক্ষার অধিকার, বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা এবং গণমুখী শিক্ষানীতির দাবিতে গড়ে ওঠা সেই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে কয়েকজন নিহত ও বহু মানুষ আহত হন। পরবর্তী সময়ে ১৭ সেপ্টেম্বর ‘মহান শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

শরীফ কমিশন ও শিক্ষানীতি

১৯৫৮ সালে সামরিক শাসনের মাধ্যমে পাকিস্তানের ক্ষমতা গ্রহণ করেন জেনারেল আইয়ুব খান। এরপর তৎকালীন শিক্ষা সচিব এস এম শরীফের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশন ‘শরীফ কমিশন’ নামে পরিচিতি পায়।

১৯৫৯ সালের ২৬ আগস্ট শরীফ কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়, যেগুলো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

কমিশনের সুপারিশের মধ্যে শিক্ষাকে ব্যয়বহুল করার আশঙ্কা তৈরি করে এমন বিভিন্ন প্রস্তাব ছিল। স্কুল-কলেজের বেতন ও ফি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে ২৭ মাসের পাস কোর্সের পরিবর্তে তিন বছর মেয়াদি ডিগ্রি কোর্স চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে ভাষা ও বর্ণমালা নিয়েও বিভিন্ন সুপারিশ ছিল। উর্দুকে পাকিস্তানের সাধারণ ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এবং বাংলা বর্ণমালার পরিবর্তে রোমান বর্ণমালা ব্যবহারের প্রস্তাবও এর মধ্যে ছিল। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করা হয়।

এসব সুপারিশকে শিক্ষার্থীরা শিক্ষার সুযোগ সংকোচন, ভাষা ও সাংস্কৃতিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ এবং ছাত্রদের রাজনৈতিক অধিকার সীমিত করার উদ্যোগ হিসেবে দেখেন। ফলে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়।

আন্দোলনের বিস্তার

শরীফ কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ বাড়তে থাকে। ১৯৬১ সাল থেকেই এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়।

১৯৬২ সালে আন্দোলন আরও সংগঠিত রূপ নেয়। ছাত্রদের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’। শরীফ কমিশনের প্রতিবেদন বাতিলের পাশাপাশি গণমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতি প্রণয়নের দাবি জানায় সংগঠনটি।

১৫ আগস্ট ১৯৬২ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ দেশব্যাপী ধর্মঘট ও বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করে। এরপর ধারাবাহিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ১৭ সেপ্টেম্বর দাবি আদায়ের লক্ষ্যে দেশব্যাপী সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়।

১৭ সেপ্টেম্বরের রক্তাক্ত ঘটনা

১৭ সেপ্টেম্বর সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্র-জনতা রাজপথে সমবেত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে একটি বড় মিছিল বের হয়ে হাইকোর্ট মোড়ের দিকে এগিয়ে যায়।

মিছিলকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। একপর্যায়ে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে গোলাম মোস্তফা, বাবুল ও ওয়াজিউল্লাহসহ কয়েকজন নিহত হন। আহত হন বহু ছাত্র ও সাধারণ মানুষ। এ সময় অসংখ্য ছাত্রনেতাকেও গ্রেপ্তার করা হয়।

১৭ সেপ্টেম্বরের এই রক্তাক্ত ঘটনার পর শিক্ষা আন্দোলন আরও ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করে। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় শরীফ কমিশনের শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন স্থগিত ও পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

স্বাধিকার আন্দোলনে শিক্ষা আন্দোলনের প্রভাব

১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন শুধু শিক্ষানীতির বিরোধিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর মধ্য দিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে অধিকার ও রাজনৈতিক সচেতনতা আরও জোরালো হয়।

পরবর্তী সময়ে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে এই রাজনৈতিক সচেতনতার প্রভাব দেখা যায়। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে মহান শিক্ষা দিবস

ছয় দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মহান শিক্ষা দিবসের গুরুত্ব এখনও রয়েছে। ১৯৬২ সালের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বার্তা ছিল শিক্ষার সুযোগকে সংকুচিত না করে তা সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য করা।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে মহান শিক্ষা দিবস শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ রোধ, সবার জন্য মানসম্মত ও সহজলভ্য শিক্ষা নিশ্চিত এবং শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

গ্রাম ও শহরের শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য দূর করে সারা দেশে যুগোপযোগী ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুক্তচিন্তা, গণতান্ত্রিক চর্চা ও গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তাও এ দিবসের আলোচনায় উঠে আসে।

মহান শিক্ষা দিবস তাই শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণের দিন নয়; এটি শিক্ষার অধিকার ও বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে ১৯৬২ সালের ছাত্রসমাজের আন্দোলন ও আত্মত্যাগকে স্মরণ করার দিন। সেই আন্দোলনে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগের স্মৃতি বহন করে দিবসটি আজও দেশের শিক্ষা ও অধিকারভিত্তিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল তরুণ ইনফ্লুয়েন্সার জেজুনের

হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক-নার্স সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

সময়মতো ন্যায্যমূল্যে কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর নির্দেশ কৃষিমন্ত্রীর

৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকায় পদ্মা ব্যারাজ, বদলে যাবে ১৯ জেলার চিত্র?

বাইন্যান্সের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে ৬৩০ কোটি ডলার চুরি, নেপথ্যে কারা?

শুঁটকিতেও মিলল বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক: শীর্ষে লইট্টা ও চিংড়ি

যুদ্ধে বিপর্যস্ত কৃষ্ণসাগর: সাড়ে ৪ বছরে ১ লাখ ২০ হাজার ডলফিনের মৃত্যু

সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জীবন বাঁচাতে তরুণদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও সিপিআর প্রশিক্ষণ

হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় দুই শিশুর মৃত্যু

কৃষকের কাছে সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছানোর তাগিদ কৃষিমন্ত্রীর

Tourism Fair Concludes with Tk 43 Crore in Business Over Three Days

তিন দিনে ৪৩ কোটি টাকার ব্যবসা, শেষ হলো পর্যটন মেলা