
মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর দমনপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাত্রা দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। দেশটির বেসামরিক জনগণের ওপর জান্তা সরকারের বাহিনী সুপরিকল্পিত ও ধারাবাহিক নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত দল। সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের বার্ষিক প্রতিবেদনে মিয়ানমারের চলমান সংঘাত, বিমান হামলা বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের ওপর চলা মানবতাবিরোধী অপরাধের চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য উঠে এসেছে।
জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্তকারী মেকানিজম (আইআইএমএম)-এর নতুন এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা দেশটির সাধারণ মানুষকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। বাড়িঘর, স্কুল, হাসপাতাল এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়শিবিরগুলোতে ইচ্ছাকৃতভাবে বিমান হামলা চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে সেনাবাহিনীর হামলায় নতুন প্রযুক্তির সংযোজন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তদন্ত দলের তথ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনী এখন ঐতিহ্যবাহী যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি মোটরচালিত গ্লাইডার ও উন্নত ড্রোন ব্যবহার বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ কোনো পূর্বসঙ্কেত বা সময় না পেয়ে চরম বিপদের মুখে পড়ছেন এবং নিরাপদে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ হারাচ্ছেন। স্কুল এবং শিশুদের লক্ষ্য করে পরিচালিত এসব বিমান হামলায় বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন।
শুধু বিমান হামলা বা সম্মুখ যুদ্ধই নয়, সামরিক বাহিনীর পরিচালিত বিভিন্ন আটক কেন্দ্রে বন্দিদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানো হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সামান্য রাজনৈতিক মতপার্থক্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা বা সামান্য প্রতিবাদের দায়েও সাধারণ মানুষকে আটক করা হচ্ছে।
২০২৫ সালে জান্তা সরকারের জারি করা কঠোর ও দমনমূলক আইনের আওতায় বহু মানুষকে দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড কিংবা মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি করা হচ্ছে। আটক কেন্দ্রগুলোতে শারীরিক নির্যাতন ছাড়াও যৌন সহিংসতার ব্যাপক প্রমাণ সংগ্রহ করেছে জাতিসংঘের তদন্ত দল। জান্তার এই ত্রাসের রাজত্বে গোটা মিয়ানমারজুড়ে এক ধরনের ভীতিকর পরিবেশ বিরাজ করছে।
জাতিসংঘের ইনডিপেনডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার (আইআইএমএম)-এর প্রধান নিকোলাস কোউমজিয়ান জানিয়েছেন, তারা এই নারকীয় তাণ্ডবের পেছনের মূল হোতাদের শনাক্ত করতে কাজ করছেন। কোন কমান্ড স্ট্রাকচারের মাধ্যমে বা কার সরাসরি নির্দেশে এসব যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্কুল ও শিশুদের ওপর বিমান হামলা চালানোর মতো সুনির্দিষ্ট ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট ইমেজ, ভিডিও ফুটেজ, ফরেনসিক আলামত এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, এই তদন্ত মেকানিজম সরাসরি কোনো বিচারিক আদালত পরিচালনা করে না; তবে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) কিংবা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) দোষীদের বিচার নিশ্চিত করার জন্য এটি একটি বিশাল তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলছে।
মিয়ানমারের চলমান এই সংকটময় পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হচ্ছে। জাতিসংঘের এই দলটির কাছে বর্তমানে ১ হাজার ৬০০ বেশি নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে সংগৃহীত অকাট্য প্রমাণ ও ডিজিটাল সাক্ষ্য সংরক্ষিত রয়েছে।
মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তার এই নৃশংসতা কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, এটি পুরো মানবসভ্যতার জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও বিশ্ববাসীর সম্মিলিত চাপ এবং এসব প্রামাণিক দলিল ভবিষ্যতে মিয়ানমারের নির্যাতিত সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিতের পথ সুগম করবে বলে আশা করা হচ্ছে।