
আফ্রিকার কৌশলগত দেশ জিবুতিতে অবস্থিত নিজেদের একমাত্র বিদেশি সামরিক ঘাঁটিতে বড় ধরনের আধুনিকায়ন সম্পন্ন করেছে চীন। এই আপগ্রেডের ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকান অঞ্চলে বেইজিংয়ের সামরিক যোগাযোগ, গোয়েন্দাগিরি এবং অপারেশনাল সক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর সম্প্রতি প্রকাশিত বিশেষ উপগ্রহ চিত্রের বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সিএসআইএস-এর ‘হিডেন রিচ’ প্রজেক্টের অধীনে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটিতে ঘাঁটির ভেতরের নতুন সামরিক ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোগুলোর বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
নতুন সংযোজন ও আধুনিকায়নের স্বরূপ :
সিএসআইএস-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে জিবুতিতে পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)-এর এই সাপোর্ট বেসের দক্ষিণ-পূর্ব এবং উত্তর-পশ্চিম কোণে দুটি নতুন যোগাযোগ ও নজরদারি কম্পাউন্ড তৈরি করা হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান স্থাপনা: এটি তুলনামূলক বড় এবং এর মধ্যে রয়েছে একটি মূল নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, হাই-ফ্রিকোয়েন্সি যোগাযোগের জন্য তিনটি ৩০ মিটার দীর্ঘ ডাইপোল অ্যান্টেনা, অতি-উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সি যোগাযোগের জন্য দুটি ছোট অ্যান্টেনা, স্যাটেলাইট কমিউনিকেশনের (স্যাটকম) জন্য তিনটি মোবাইল ডিশ অ্যান্টেনা, সম্ভাব্য চারটি ৫জি টাওয়ার এবং একটি রাডোম (যা সংবেদনশীল রাডার সরঞ্জাম ঢেকে রাখে)।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় ও অন্যান্য অবকাঠামো: ঘাঁটির অন্যত্র ক্রশড ডাইপোল এইচএফ অ্যান্টেনা এবং আরেকটি রাডোম স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৫ সালে অতিরিক্ত রিইনফোর্সল কেবল ট্র্রেঞ্চ (খাদ) তৈরি করা হয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় ভবিষ্যতে সেখানে আরও অ্যান্টেনা (সরঞ্জাম) যুক্ত করা হতে পারে।
সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স এবং সি-ফোর আইএসআর নেটওয়ার্ক :
গবেষকদের মতে, এই নতুন সরঞ্জামগুলো ঘাঁটির ভেতরের যোগাযোগের পাশাপাশি সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স (সিগিন্ট) সংগ্রহ করার কাজে অত্যন্ত কার্যকর। এগুলোর ফ্রিকোয়েন্সি ও বহুমুখী দিকবিন্যাস-এর কারণে পিএলএ এখন এই অঞ্চলে চলাচলকারী তাদের যুদ্ধজাহাজ এবং সামরিক বিমানের সঙ্গে অত্যন্ত সুরক্ষিত ও দীর্ঘপাল্লার ‘ওভার-দ্য-হরাইজন’ যোগাযোগ রক্ষা করতে পারবে। একই সঙ্গে বেইজিংয়ে অবস্থিত মূল কমান্ড হেডকোয়ার্টারের সঙ্গেও সরাসরি ও নিরাপদ যোগাযোগ বজায় রাখা সম্ভব হবে।
এই দুটি নতুন সুবিধা মূলত একটি সমন্বিত ‘সি-ফোর-আই-এস-আর’ (কমান্ড, কন্ট্রোল, কমিউনিকেশন্স, কম্পিউটার্স, ইন্টেলিজেন্স, সার্ভেইল্যান্স অ্যান্ড রিকনেসান্স) কাঠামোর দুটি অংশ হিসেবে কাজ করছে। এর মাধ্যমে এই অঞ্চলে সক্রিয় অন্যান্য দেশের সামরিক বাহিনীর গতিবিধি ও সিগন্যাল মনিটর করার ক্ষেত্রে চীনের সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।
যে কারণে এই ঘাঁটির ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব এত বেশি :
জিবুতি লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরকে সংযোগকারী মাত্র ২০ মাইল চওড়া কৌশলগত ‘বাব এল-মান্দেব’ প্রণালীর প্রবেশদ্বারে অবস্থিত, যে রুট দিয়ে বিশ্ব সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ১৬ শতাংশ পরিচালিত হয়। এই ভৌগোলিক গুরুত্বের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইতালি ও জাপানের মতো পরাশক্তিগুলোরও সামরিক ঘাঁটি রয়েছে জিবুতিতে (চীনসহ অধিকাংশ দেশের ঘাঁটিগুলোর দূরত্ব মাত্র কয়েক কিলোমিটারের ব্যবধানে)।
চীন ২০১৭ সালের ১ আগস্ট পিপলস লিবারেশন আর্মির প্রতিষ্ঠার ৯০ বছর পূর্তিতে জিবুতিতে তাদের এই প্রথম বৈদেশিক সামরিক লজিস্টিকস বেস আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করে। শুরুর দিকে বেইজিং একে কেবল সোমালিয়া উপকূল ও এডেন উপসাগরে জলদস্যু দমন, নেভাল এসকর্ট বা মানবহিতৈষী মিশনে সহায়তাকারী একটি সাধারণ লজিস্টিকস সেন্টার হিসেবে পরিচয় দিলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর রূপ ও সক্ষমতা আমূল বদলে গেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকট এবং লোহিত সাগর অঞ্চলে সংঘাতের কারণে এই ঘাঁটির গোয়েন্দা মূল্য ও কৌশলগত গুরুত্ব চীনের কাছে বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জিবুতির ঘাঁটিটি এখন কেবল সাধারণ রসদ সরবরাহের কেন্দ্র নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাজুড়ে বেইজিংয়ের একটি স্থায়ী এবং শক্তিশালী নজরদারি ও কমান্ড নোডে পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে ও দূরবর্তী সমুদ্রে নিজেদের সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব আরও সুদৃঢ় করার পথে চীন আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।