
রাঙ্গামাটির ১০টি উপজেলায় ৩৮৯টি বিদ্যুৎবিহীন বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০০টি বিদ্যালয় অতি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত। এসব বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করতে সোলার প্যানেল স্থাপনের পরিকল্পনা করছে সরকার। বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হলে দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীরা মাল্টিমিডিয়া ক্লাস ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নবায়নযোগ্য জ্বালানি অধিশাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাঙ্গামাটির অতি দুর্গম বিদ্যালয়গুলোতে সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের জেলা প্রশাসক সম্মেলনে রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক এসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সোলার প্যানেল স্থাপনের প্রস্তাব দেন। পরে বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে সম্মত হয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পরিকল্পনাটি দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়নের চিন্তা করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে পাঁচ বছর মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এর আগে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎবিহীন বিদ্যালয়গুলোর তালিকা তৈরি করে বিদ্যুৎ বিভাগে জমা দিতে হবে। এরপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর প্রকল্পগুলোর আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। মাঠপর্যায়ে প্রকল্পের প্রধান তদারকির দায়িত্বে থাকবে জেলা প্রশাসন।
তবে এখনো এসব প্রকল্প উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) হিসেবে অনুমোদন পায়নি।
জেলা প্রশাসন ও বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দুর্গম বিদ্যালয়গুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হলে শিক্ষার পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। শিক্ষার্থীরা মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের পাশাপাশি বিভিন্ন ডিজিটাল তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পাবে।
রাঙ্গামাটির দুর্গম এলাকার এসব বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের অধিকাংশের পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। ফলে বিদ্যালয়ে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ তৈরি হলে এসব শিক্ষার্থী দেশের অন্যান্য এলাকার বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির ৫৫০টি বিদ্যালয়ে টিভি ও মাল্টিমিডিয়া সংযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ১৪৯টি বিদ্যালয় ই-লার্নিং কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে শতভাগ বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।
তিনি জানান, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায় বাস্তবায়নের জন্য সরকারি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অননুমোদিত বা বরাদ্দহীন প্রকল্প হিসেবে একটি প্রস্তাব নথিভুক্ত হয়েছে।
নতুন প্রস্তাবিত এসব প্রকল্পকে ‘সবুজ পাতা প্রকল্প’ বলা হয়। এটি ভবিষ্যৎ কাজের জন্য নীতিগত সম্মতি বা প্রাথমিক তালিকা। পরবর্তী সময়ে অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রকল্পটি মূল কার্যক্রম বা ডিপিপিতে স্থান পায়।
মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, প্রকল্পটি ডিপিপিতে স্থান পেলে দীর্ঘমেয়াদে পাঁচ বছর মেয়াদে এর কাজ শুরু হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ সালে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে ২০৩১ সালে শেষ হওয়ার কথা।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, পার্বত্য তিন জেলার দুর্গম এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় শিক্ষার মানোন্নয়নের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুতের অভাবে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেও পিছিয়ে পড়ছে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষ।
এ কারণে এসব এলাকায় সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি বছরের মে মাসে অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক সম্মেলনে বিদ্যুৎ বিভাগ-সংক্রান্ত বিষয়াবলিতে রাঙ্গামাটির দুর্গম পাহাড়ি এলাকার ৩০০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সোলার প্যানেল স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়।
এরপর প্রস্তাবটির বাস্তবতা যাচাই এবং প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব কি না, তা বিবেচনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে চিঠি পাঠানো হয়।
পরে কাজের অগ্রগতি জানিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে এসব বিদ্যালয়ে সোলার প্যানেল স্থাপনের পক্ষে মতামত দিয়েছে।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে রাঙ্গামাটির দুর্গম পাহাড়ি এলাকার বিদ্যুৎবিহীন বিদ্যালয়গুলোতে আধুনিক শিক্ষার সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে এসব অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল শিক্ষার মূলধারায় যুক্ত করার পথও আরও সহজ হবে।