
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। কিন্তু হাড় দুর্বল হয়ে গেলেও অনেক সময় বাইরে থেকে এর কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। হঠাৎ পড়ে গিয়ে হাড় ভেঙে যাওয়ার পরই অনেকে জানতে পারেন যে তারা অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত। এমন ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ডিএক্সএ (DXA) স্ক্যান। স্বল্পমাত্রার এক্স-রে ব্যবহার করে মাত্র ১০ থেকে ২০ মিনিটের এই পরীক্ষায় হাড়ের ঘনত্ব ও শক্তি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে সবার জন্য এই পরীক্ষা প্রয়োজন নয়—বয়স ও ঝুঁকি অনুযায়ী কার ডিএক্সএ স্ক্যান করা উচিত, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব মেডিসিনের রেডিওলজি ও মেডিকেল ইমেজিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাইকেল পেরির মতে, ডিএক্সএ বা ‘ডুয়াল-এনার্জি এক্স-রে অ্যাবসর্পটিওমেট্রি’ হলো এমন একটি ইমেজিং পরীক্ষা, যার মাধ্যমে হাড়ের স্বাস্থ্য মূল্যায়ন করা যায়। এতে মূলত হাড়ের শক্তি ও খনিজ উপাদান পরিমাপ করা হয়। এসব তথ্য থেকে অস্টিওপোরোসিস এবং হাড় ভাঙার ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
বয়স্কদের ক্ষেত্রে হাড় ভেঙে যাওয়া বড় ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যার সূচনা করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার কারণ হতে পারে। এ কারণে বয়স বাড়ার সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কীভাবে করা হয় ডিএক্সএ স্ক্যান?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিএক্সএ স্ক্যান নিরাপদ, দ্রুত ও ব্যথাহীন একটি পরীক্ষা। পরীক্ষার সময় রোগীকে একটি প্যাডযুক্ত টেবিলে চিৎ হয়ে শুতে হয়। এরপর একটি স্ক্যানিং আর্ম শরীরের ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে চলে যায়।
দুটি স্বল্পমাত্রার এক্স-রে রশ্মির মাধ্যমে বিশেষ করে কোমর ও মেরুদণ্ডের হাড়ে থাকা খনিজ পদার্থের পরিমাণ পরিমাপ করা হয়। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে সাধারণত ১০ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগে।
শুধু হাড়ের ঘনত্ব নয়, ডিএক্সএ স্ক্যানের মাধ্যমে শরীরের গঠন সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে শরীরে মোট চর্বির পরিমাণ, চর্বি কোথায় জমা হয়েছে এবং লিন মাস বা চর্বিবিহীন টিস্যুর পরিমাণ পরিমাপ করা যায়।
কাদের ডিএক্সএ স্ক্যান করা উচিত?
জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির স্কুল অব মেডিসিনের রেডিওলজি ও রেডিওলজিক্যাল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. শাদপুর দেমেহরির মতে, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীদের এবং ৭০ বছর বা তার বেশি বয়সী পুরুষদের ডিএক্সএ স্ক্যান করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
তবে কম বয়সীদেরও এ পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে, যদি তাদের অস্টিওপোরোসিসের উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি থাকে।
ঝুঁকির কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে সামান্য পড়ে যাওয়া বা আঘাতের কারণে আগে হাড় ভাঙা, দীর্ঘদিন প্রেডনিসোনের মতো স্টেরয়েড ওষুধ ব্যবহার, পরিবারে অস্টিওপোরোসিস বা হিপ ফ্র্যাকচারের ইতিহাস এবং কিছু শারীরিক অসুস্থতা। দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগ সিওপিডি (ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ)-এর মতো কিছু অবস্থার ক্ষেত্রেও ডিএক্সএ স্ক্যান প্রয়োজন হতে পারে।
অস্টিওপোরোসিসকে অনেক সময় ‘নীরব রোগ’ বলা হয়। কারণ হাড়ের ঘনত্ব কমে গেলেও অনেক মানুষ ফ্র্যাকচার হওয়ার আগে বিষয়টি বুঝতে পারেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫০ বছরের বেশি বয়সী প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে একজন এবং প্রতি পাঁচজন পুরুষের মধ্যে একজন অস্টিওপোরোটিক ফ্র্যাকচারের শিকার হন।
সবার জন্য কি এই পরীক্ষা প্রয়োজন?
ডিএক্সএ স্ক্যানে তুলনামূলকভাবে কম মাত্রার বিকিরণ ব্যবহার করা হয় এবং বেশিরভাগ মানুষের জন্য এটি নিরাপদ বলে বিবেচিত। তবে গর্ভাবস্থায় পরীক্ষা সাধারণত স্থগিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়, কারণ এতে আয়নাইজিং রেডিয়েশন ব্যবহৃত হয়।
এ ছাড়া সম্প্রতি বেরিয়াম স্টাডির মতো কনট্রাস্ট উপাদান ব্যবহার করা কোনো ইমেজিং পরীক্ষা করালে ডিএক্সএ স্ক্যান কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে দিতে হতে পারে। এসব উপাদান পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে তরুণ ও সুস্থ মানুষের জন্য নিয়মিত ডিএক্সএ স্ক্যান সাধারণত জরুরি নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের চর্বির পরিমাণ জানলেও অধিকাংশ তরুণের চিকিৎসা বা জীবনযাপনের পরামর্শে বড় কোনো পরিবর্তন আসে না।
শুধু ওজন নয়, শরীরের গঠনও গুরুত্বপূর্ণ
ডিএক্সএ স্ক্যান শরীরের গঠন সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে বিস্তারিত তথ্য দিতে পারে। ড. মাইকেল পেরি বলেন, অনেক সময় মানুষ শরীরের ওজনকে স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেন। কিন্তু ওজন শুধু শরীরে মোট টিস্যুর পরিমাণ জানায়, টিস্যুগুলো কী ধরনের তা জানায় না।
উদাহরণ হিসেবে, কারও ওজন বেশি হলেও তার শরীরে পেশীর পরিমাণ বেশি এবং চর্বি কম হতে পারে। আবার কারও ওজন স্বাভাবিক হলেও পেশীর পরিমাণ কম থাকায় তার পড়ে যাওয়া বা অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বেশি হতে পারে।
তবে এ কারণে তরুণদের নিয়মিত ডিএক্সএ স্ক্যান করানো প্রয়োজন—এমনটা মনে করেন না বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ, শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম, সুষম খাবার এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
হাড়ের ঘনত্ব কমে গেলে কী করবেন?
ডিএক্সএ স্ক্যানে হাড়ের ঘনত্ব কম পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমাতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত ভারবহনকারী ব্যায়াম ও রেজিস্ট্যান্স বা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি খাবার বা প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান এড়িয়ে চলার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হাড় শক্তিশালী করার ওষুধও ব্যবহার করা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাড় ও পেশির স্বাস্থ্য একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। শক্তিশালী পেশি শরীরের কঙ্কালকে সমর্থন করে, ভারসাম্য উন্নত করে এবং পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। অন্যদিকে সুস্থ হাড় শরীরের চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামোগত ভিত্তি তৈরি করে।
তাই বয়স ও ঝুঁকি অনুযায়ী প্রয়োজন হলে ডিএক্সএ স্ক্যান করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি হাড় ও পেশির স্বাস্থ্য ভালো রাখতে নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাবার ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।