
পরিকল্পিত সড়ক ডিজাইনের মাধ্যমে পথচারীদের নিরাপদ সড়ক পারাপার নিশ্চিত করা, সিগনাল ও জেব্রা ক্রসিংয়ের পূর্বে রেইজড ক্রসিং (সড়ক থেকে উচুঁ করে ফুটপাথ সমান্তরাল পারাপার) ও গতিরোধক স্থাপনের মাধ্যমে যানবাহনের অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলে সড়ক পথচারীদের জন্য অনেকাংশে নিরাপদ হয়ে উঠবে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউট (ডব্লিউআরআই) এর উদ্যোগে আজ (১১ জুলাই) ডিএনসিসি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত প্রশিক্ষণে বক্তারা এ কথা বলেন।
‘ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিস ইনিশিয়েটিভ ফর গ্লোবাল রোড সেফটি’ (বিআইজিআরএস) এর আওতায় দিনব্যাপী এ প্রশিক্ষণ উদ্বোধন করেন ডিএনসিসি’র প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান। বিআইজিআরএস বাংলাদেশ সমন্বয়কারী ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুল ওয়াদুদ এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ডিএনসিসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (উপসচিব) মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান, প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেঃ জেনাঃ সৈয়দ রাকিবুল হাসান, পি.এস.সি এবং অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আলম। উদ্বোধনী পর্ব সঞ্চালনা করেন ভাইটাল স্ট্রাটেজিস এর টেকনিক্যাল এডভাইজর আমিনুল ইসলাম সুজন।
ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ঢাকা উত্তরের সড়কসমূহ পর্যায়ক্রমিকভাবে নিরাপদ করা হবে। এ লক্ষ্যে সড়ক ডিজাইন, নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ায় জড়িত প্রকৌশলী, নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতিদের দক্ষতাবৃদ্ধির পাশাপাশি সড়ক নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনাকারী সংস্থাসমূহের আন্তঃসমন্বয় জরুরি। আগামী দিনে সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হবে।
তিনি আরো বলেন, সড়ক নিরাপত্তাসহ শহরের সমন্বিত উন্নয়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খুবই ইতিবাচক। সড়ক নিরাপত্তায় ডিএনসিসি’ ও ব্লমবার্গ ফিলানথ্রপিস ইনিশিয়েটিভ ফর গ্লোবাল রোড সেফটি (বিআইজিআরএস) এর আওতায় ঢাকায় চলমান কার্যক্রম মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অবগত করা হবে। ডিএনসিসি প্রশাসক প্রকৌশলীদের আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সড়কের নিরাপদ ডিজাইন প্রণয়নের আহবান জানান, যেনো সড়কে মানুষের দুর্ভোগ ও ঝুঁকি কমে আসে।
ডিএনসিসি’র প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেঃ জেনাঃ সৈয়দ রাকিবুল হাসান বলেন, ডিএনসিসি’র আওতাধীন সড়কসমূহ নিরাপদ করার কাজ চলমান রয়েছে। ডিএমপি’র সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে রোড ক্র্যাশের স্থানের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক চিহ্নিত করে নতুন ডিজাইনের মাধ্যমে নিরাপদ করা হচ্ছে। নিরাপদ সড়ক ডিজাইন সম্পর্কে ডিএনসিসি’র প্রকৌশলী ও নগর পরিকল্পনাবিদদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।
ডিএনসিসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, ডিএনসিসি ইতোমধ্যে সড়ক নিরাপত্তায় করণীয় ও সমাধাননির্ভর প্রতিবেদনের জন্য সাংবাদিকদের উৎসাহ প্রদানের জন্য প্রশিক্ষণ আয়োজন, চালক ও সড়ক ব্যবহারকারীদের গতিসীমা সম্পর্কে সচেতন করতে মাসমিডিয়া ক্যাম্পেইন আয়োজন করেছে। এ কার্যক্রমের পরিধি আরো বাড়ানোর জন্য তিনি ভাইটাল স্ট্রাটেজিসকে অনুরোধ জানান।
বিআইজিআরএস, বাংলাদেশ সমন্বয়কারী মো. আবদুল ওয়াদুদ বৈশ্বিক সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রম তুলে ধরে বলেন, পৃথিবীর ২৭টির বেশি ঘনবসতিপূর্ণ শহরে সড়ক নিরাপত্তার এ কর্মসূচির আওতায় সড়কে অকালমৃত্যু প্রতিরোধে নিরাপদ সড়ক ও অবকাঠামো ডিজাইন, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ সড়ক পারাপার, গতিসীমা ও ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, বিদ্যমান ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন এবং সড়ক নিরাপত্তার লক্ষ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে নিরাপদ সড়ক ডিজাইন কাজে সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য ডিএনসিসি’র চারজন কর্মকর্তা, যথাক্রমে সহকারী প্রকৌশলী শ্যামল কুমার সরকার, তিনজন উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. সোহেল রানা, মো. বাবর আহমেদ ও মো. মহিনুর ইসলাম-কে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। ডিএনসিসি প্রশাসক সবার হাতে স্মারক তুলে দেন। এ সময় আন্তর্জাতিক সংস্থা ডব্লিউআরআই’র পক্ষ থেকে ডিএনসিসি প্রশাসকের হাতে স্মারক তুলে দেয়া হয়।
প্রশিক্ষণে নিরাপদ সড়ক ডিজাইন – বাংলাদেশ প্রেক্ষিত, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, গতি নিয়ন্ত্রণে সড়ক ডিজাইন ইত্যাদি বিভিন্ন সেশন পরিচালনা করেন ডাব্লিউআরআই পরামর্শক ফারজানা ইসলাম তমা, সহযোগী পরামর্শক আরিনা তাহনীম ও আরবান রেজিলিয়েন্স ও নলেজ ম্যানেজমেন্ট ম্যানেজার রেত্নো হুইনানেস্টা (Retno Whinanesta)। এছাড়া, ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) দক্ষিণের মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা) ও মেট্রোরেল লাইন-৫ এর উপ-প্রকল্প পরিচালক (উপসচিব) সোহেল রানা ঢাকার যাতায়াতে মেট্রোরেলের সঙ্গে সড়ক পরিবহনের সমন্বয় বিষয়ে প্রেজেন্টেশান তুলে ধরেন।
প্রশিক্ষকগণ নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে শহর ও সড়ক পরিকল্পনার সমন্বয়, সড়ক নিরাপত্তায় অবকাঠামোগত ডিজাইন এবং নিরাপদ যাতায়াতের গুরুত্ব ও করণীয় ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় প্রাতিষ্ঠানিক ও একাডেমিক অভিজ্ঞতার আলোকে তুলে ধরেন। অংশগ্রহণকারীগণ বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে নিরাপদ ডিজাইনের বিভিন্ন বিষয়ে দলগতভাবে আলোচনা করেন এবং দলীয় উপস্থাপনা তুলে ধরেন। দলগত আলোচনা সমন্বয় করেন বিআইজিআরএস-এর ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেটর ইঞ্জিনিয়ার মো. রেজাউর রহমান।
ফারজানা ইসলাম তমা বলেন, সড়ক নিরাপত্তায় অবকাঠামোগত ডিজাইনের গুরুত্ব বিশ্বব্যাপী প্রমাণিত। বিভিন্ন দেশের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, উন্নত দেশগুলোতে পথচারী ও বাইসাইকেল ব্যবহারকারীদের প্রাধান্য দিয়ে সড়ক ডিজাইন করা হয়, যা সকলের জন্য নিরাপদ হয়ে উঠে। ঢাকার সড়ক নিরাপদ করতে পথচারীসহ ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্য সড়কে নিরাপদ করা প্রয়োজন।
প্রশিক্ষণে গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ নির্দেশিকা সম্পর্কে প্রচারণার জন্য মাসমিডিয়া ক্যাম্পেইন ভিডিওচিত্র “রেবেকা’র স্বজন হারানোর গল্প ও গতিসীমা মেনে গাড়ি চালানোর গুরুত্ব” প্রদর্শন করা হয়। আন্তর্জাতিক সংস্থা ভাইটাল স্ট্রাটেজিস কর্তৃক নির্মিত ভিডিওচিত্র ডিএনসিসি, ডিএমপি, বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সড়ক নিরাপত্তায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিকালে সমাপনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী প্রশিক্ষণার্থীদের সনদপত্র তুলে দেন ডিএনসিসি’র প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেঃ জেনাঃ সৈয়দ রাকিবুল হাসান। তিনি ডিএনসিসি, বিআরটিএ, ডিএমপি ও ডিটিসিএ’র সংশ্লিষ্ট কর্তকর্তাদের দক্ষতাবৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ আয়োজন করায় ডব্লিউআরআই ও বিআইজিআরএস-কে ধন্যবাদ জানান। একইসঙ্গে তিনি এ ধরণের প্রশিক্ষণ আরো বেশি ও বড় কলেবরে করার জন্য ডব্লিউআরআই’র প্রতি অনুরোধ জানান।
প্রশিক্ষণে ডিএনসিসি’র অর্ধশতাধিক প্রকৌশলী অংশ নেন। এছাড়া, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ) এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) এর কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন। এ সময়, ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ) এর সিনিয়র রোড সেফটি স্পেশালিস্ট মামুনুর রহমান, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) উপ-পরিচালক সুবীর কুমার সরকার, ডিএনসিসি’র নির্বাহী প্রকৌশলী (ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেল) নাঈম রায়হান খান, বিআইজিআরএস-এর এনফোর্সমেন্ট কোঅর্ডিনেটর গোলাম রহমান ও সার্ভিলেন্স কোঅর্ডিনেটর ডা. তানভীর ইবনে আলী উপস্থিত ছিলেন।