বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর ৭ এপ্রিল World Health Day পালিত হয়। ১৯৪৮ সালের ৭ এপ্রিল জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এই দিনটিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। যার মূল লক্ষ্য বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়গুলোকে সামনে আনা এবং একটি সুস্থ পৃথিবী গড়ে তোলার আহ্বান জানানো। স্বাস্থ্যের বিভিন্ন বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে দিবসটি পালনের লক্ষ্যে প্রতিবছর একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ÒTogether for health. Stand with science”। ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যকে শুধুমাত্র চিকিৎসাসেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে ভাবা আর সম্ভব নয়। বরং স্বাস্থ্য এখন পরিবেশ, জলবায়ু, জ্বালানি, নগর পরিকল্পনা এবং পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি সমন্বিত বিষয়।
জলবায়ু বিপর্যয় আজ বিশ্ব স্বাস্থ্যের জন্য এক বড় হুমকি। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং বায়ুদূষণ মানুষের স্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশসহ উপকূলীয় দেশগুলো এই ঝুঁকির মুখে সবচেয়ে বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া, শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ বিভিন্ন সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও সহনশীল ও প্রস্তুত রাখতে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ অপরিহার্য।
এক্ষেত্রে নগর পরিকল্পনা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গার অভাব, বায়ুদূষণ, যানজট এসবই নাগরিক জীবনে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। একটি স্বাস্থ্যবান্ধব নগর গড়ে তুলতে প্রয়োজন নিরাপদ হাঁটার পথ, সাইকেল লেন, সবুজ এলাকা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা কেবল পরিবেশ রক্ষা করে না, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে সহজ ও স্বাস্থ্যসম্মত করে তোলে।
এই প্রেক্ষাপটে অযান্ত্রিক যানবাহনের ব্যবহার বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ। হাঁটা, সাইকেল চালানো বা প্যাডেল রিকশার মতো পরিবহন ব্যবস্থা শুধু পরিবেশবান্ধবই নয়, এটি মানুষের শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করতেও সহায়ক। নিয়মিত হাঁটা বা সাইকেল চালানো হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও স্থূলতা কমাতে সাহায্য করে। একইসাথে এটি জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমায় এবং বায়ুদূষণ হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই নগর পরিকল্পনায় অযান্ত্রিক যানবাহনের জন্য নিরাপদ অবকাঠামো তৈরি করা সময়ের দাবি।
এছাড়াও বিশ্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো জ্বালানি সংকট। স্বাস্থ্যখাতের প্রতিটি স্তর হাসপাতাল, ক্লিনিক, ল্যাবরেটরি, ভ্যাকসিন সংরক্ষণ ব্যবস্থাসহ সবকিছুই নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর। বিদ্যুৎ ঘাটতি বা জ্বালানির অস্থিতিশীলতা চিকিৎসা সেবাকে ব্যাহত করে, জরুরি সেবার মান কমিয়ে দেয় এবং রোগীর জীবনঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। তাই টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের দিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
এই সবকিছুর মধ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হলে প্রয়োজন বহুমাত্রিক উদ্যোগ। আধুনিক প্রযুক্তি ও নির্ভুল ডায়াগনোসিস, গবেষণা ও উদ্ভাবন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি প্রয়োজন আন্তঃখাত সমন্বয়। স্বাস্থ্য, জ্বালানি, পরিবেশ, পরিবহন ও নগর উন্নয়ন-সব ক্ষেত্রেই একসাথে কাজ করতে হবে।
জনসচেতনতা এখানে একটি মূল চালিকাশক্তি। নাগরিকদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা, পরিবেশবান্ধব আচরণ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে। একইসাথে নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে একটি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ স্বাস্থ্য রক্ষা শুধু চিকিৎসকদের দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। অর্থাৎ বিজ্ঞান ভিত্তিক বিষয়গুলোকে সঙ্গে নিয়ে, সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং সম্মিলিতভাবে কাজ করে একটি সুস্থ, নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হবে।
লেখক: শানজিদা আক্তার, উন্নয়নকর্মী


