ঢাকাবৃহস্পতিবার , ১৬ এপ্রিল ২০২৬
  • অন্যান্য

আজকের সর্বশেষ সবখবর

যোগ্য নেতৃত্ব ছাড়া শ্রমিকদের সহজিকরণ ট্রেড ইউনিয়ন গঠন , ইতিবাচক হবে না

কাজী হাবিবুর রহমান রনজু
এপ্রিল ১৬, ২০২৬ ১২:৫০ অপরাহ্ণ । ২৬ জন

শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো ট্রেড ইউনিয়ন। আধুনিক শ্রমব্যবস্থায় ট্রেড ইউনিয়ন কেবল মজুরি বৃদ্ধির দাবিদার সংগঠন নয়; এটি শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা, কর্মপরিবেশের উন্নয়ন এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এই বাস্তবতায় শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজীকরণকে একটি ইতিবাচক সংস্কার হিসেবে দেখা হয়। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, শুধু আইনগত ও প্রশাসনিক সহজীকরণই কি শ্রমিক স্বার্থ রক্ষায় যথেষ্ট? বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, যোগ্য নৈতিক ও দূরদর্শী নেতৃত্ব ছাড়া ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজীকরণ শেষ পর্যন্ত ফলদায়ক হয় না; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা নতুন সংকটের জন্ম দেয়।

ট্রেড ইউনিয়নের উদ্দেশ্য ও বাস্তব চিত্র: ট্রেড ইউনিয়নের মূল উদ্দেশ্য হলো শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করে তাদের ন্যায্য দাবি আদায়, শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং মালিক–শ্রমিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ট্রেড ইউনিয়ন শ্রমিক স্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তিগত ক্ষমতা অর্জন, দলীয় রাজনীতি কিংবা গোষ্ঠীগত স্বার্থের বাহনে পরিণত হয়েছে। এর ফলে শ্রমিকরা সংগঠিত হলেও প্রকৃত অর্থে উপকৃত হয় না; বরং বিভক্তি, সহিংসতা ও অনাস্থা বৃদ্ধি পায়।

ট্রেড ইউনিয়নের কার্যকারিতা নির্ভর করে তার নেতৃত্বের ওপর। যোগ্য নেতৃত্ব বলতে শুধু বক্তৃতা দেওয়ার ক্ষমতা নয়; বরং শ্রম আইন সম্পর্কে জ্ঞান, আলোচনায় দক্ষতা, নৈতিকতা, শ্রমিকদের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চিন্তাকে বোঝায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বহু ক্ষেত্রে নেতৃত্বে আসেন এমন ব্যক্তিরা, যারা শ্রমিকদের দুর্দশাকে পুঁজি করে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে আগ্রহী। ফলে ইউনিয়ন শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার বদলে দ্বন্দ্ব ও অস্থিরতার উৎসে পরিণত হয়।

ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজীকরণের উদ্দেশ্য হলো শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু যোগ্য নেতৃত্বের ঘাটতিতে এই সহজীকরণ অনেক সময় বিপরীত ফল বয়ে আনবে। অদক্ষ নেতৃত্বের হাতে ইউনিয়ন পড়লে, শ্রমিকদের বাস্তব দাবি কখনও অগ্রাধিকার পাবে না। ফলে মালিকপক্ষের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সংঘাত সৃষ্টি হবে, কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হবে, শ্রমিকদের বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়ায় শ্রমিকরা দীর্ঘমেয়াদে আরও অনিরাপদ হয়ে পড়বে।

রাজনীতিকরণ ও আস্থাহীনতা: যোগ্য নেতৃত্বের অভাব ট্রেড ইউনিয়নকে সহজেই দলীয় রাজনীতির উপকরণে পরিণত করে। এতে শ্রমিকদের স্বার্থ গৌণ হয়ে যায় এবং ইউনিয়নের প্রতি শ্রমিকদের আস্থা নষ্ট হয়। অনেক শ্রমিক তখন ইউনিয়নকে নিজের অধিকার রক্ষার সংগঠন নয়, বরং ঝুঁকির উৎস হিসেবে দেখতে শুরু করে। এর ফলে সংগঠিত শ্রম আন্দোলনের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।

সমাধানের পথ: নেতৃত্ব উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজীকরণের পাশাপাশি নেতৃত্ব উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য, ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্বের জন্য প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা

শ্রম আইন ও আলোচনাকৌশল বিষয়ে নিয়মিত শিক্ষা, স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব নির্বাচন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ইউনিয়ন সংস্কৃতি গড়ে তোলা, জবাবদিহিমূলক ও নৈতিক নেতৃত্ব নিশ্চিত করা। এই বিষয়গুলোকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজীকরণ নিঃসন্দেহে শ্রমিক অধিকার রক্ষার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু এটি যদি যোগ্য, সচেতন ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বিত না হয়, তবে সেই সংস্কার কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। বাস্তবে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের বদলে তা নতুন জটিলতা সৃষ্টি করবে। তাই শ্রমিক আন্দোলনকে কার্যকর ও টেকসই করতে হলে প্রথম ও প্রধান সংস্কার হতে হবে যোগ্য নেতৃত্বের বিকাশ ও প্রতিষ্ঠা। যোগ্য নেতৃত্ব ছাড়া কোনো কাঠামোগত সহজীকরণই দীর্ঘমেয়াদে শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে না।