
ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় নদীগুলোতে কয়েক সপ্তাহ ধরে দেখা যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ ভাসমান কাঠের গুড়ি, যা এখন সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের নদীতেও প্রবেশ করছে। বিশেষ করে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও রংপুর জেলার তিস্তা ও ধরলা নদীতে স্থানীয়রা বলছেন—“এরকম দৃশ্য আগে কখনো দেখা যায়নি।” নদীর পানির সঙ্গে ভেসে আসছে বড় বড় গাছের কাণ্ড, কিছু কাঠে এমনকি কাটার দাগ ও প্রক্রিয়াজাত চিহ্নও দেখা যাচ্ছে, যা প্রমাণ করে এগুলো প্রাকৃতিকভাবে নয়, বরং সংরক্ষিত জায়গা বা কাঠের ডিপো থেকে এসেছে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহার জেলার নদীগুলোতে প্রথম এই কাঠ ভেসে আসতে দেখা যায়। তদন্তে জানা গেছে, এই কাঠগুলোর মূল উৎস ভুটানের পারো ও চুখা জেলার সরকারি টিম্বার ডিপো। প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ওই সব ডিপোতে সংরক্ষিত হাজার হাজার কাঠ নদীতে ভেসে যায় এবং তোর্সা নদী ধরে ভারতের দোয়ার্স অঞ্চলে প্রবেশ করে। সেখান থেকে প্রবল স্রোতে কাঠগুলো গড়িয়ে পড়ছে তিস্তা ও ধরলা নদীর সঙ্গে যুক্ত উপনদীগুলোতে, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের নদীতে এসে পড়ছে।
বাংলাদেশের নদীপথে এখন যে পরিমাণ কাঠ ভেসে আসছে, তা স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহলের পাশাপাশি আতঙ্কও সৃষ্টি করেছে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, এসব কাঠ সেতু ও স্লুইসগেটের মুখে আটকে গিয়ে নদীর প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তিস্তা ব্যারাজ এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, বাঁধের নিকটবর্তী স্থানে কাঠ জমে নদীর পানিপ্রবাহ ধীর হয়ে গেছে। এতে বন্যার আশঙ্কাও বেড়ে গেছে।
পরিবেশবিদদের মতে, এই ঘটনাটি নিছক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়, বরং এতে মানবসৃষ্ট অব্যবস্থাপনাও ভূমিকা রেখেছে। ভুটান ও ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলে বছরের পর বছর ধরে টিম্বার সংরক্ষণাগারগুলো যথাযথভাবে সুরক্ষিত নয়। এছাড়া অবৈধ বননিধন ও কাঠ পাচার বন্ধে নজরদারিও দুর্বল। ফলে পাহাড়ি বৃষ্টিতে সামান্য ভারী ঢল নামলেই এসব কাঠ নদীতে ভেসে চলে আসে।
বাংলাদেশের নদীগুলোর জন্য এই ঘটনা পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নদীতে বিপুল পরিমাণ কাঠ ভাসতে থাকলে পানির অক্সিজেনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নদীর তলদেশে কাঠ জমে স্রোত পরিবর্তিত হতে পারে। এর পাশাপাশি, এসব কাঠ অবৈধভাবে সংগ্রহ ও বিক্রির চেষ্টা করলে তা নতুন পরিবেশ অপরাধের জন্ম দিতে পারে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্তবর্তী নদীগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে এ বিষয়ে যৌথ তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। কারণ, এই স্রোত যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নিচু এলাকা এবং চরাঞ্চলগুলো নতুনভাবে ঝুঁকিতে পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী পারাপার কাঠের এই স্রোত আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, পরিবেশের ভারসাম্য এক দেশের নয়, বরং পুরো অঞ্চলের বিষয়। পাহাড়ে বন ধ্বংস হলে তার প্রভাব অবশেষে সমতল ভূমিতেই এসে পড়ে। তাই এখন সময় এসেছে বাংলাদেশ, ভারত ও ভুটানের মধ্যে সীমান্তবর্তী বন ও নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমন্বিত নীতিমালা তৈরির।