
বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ হুমকিতে পরিণত হচ্ছে বলে নতুন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। মঙ্গলবার প্রকাশিত ‘অ্যান আনসাসটেইনেবল লাইফ: দ্য ইমপ্যাক্ট অব হিট অন হেলথ অ্যান্ড দ্য ইকোনমি অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তীব্র গরম মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং উৎপাদনশীলতা কমিয়ে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হচ্ছে।
১৯৭৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার প্রবণতা বিশ্লেষণ এবং ২০২৪ সালে ১৬ হাজারেরও বেশি মানুষের ওপর করা জরিপের তথ্য এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। দেখা যায়, ১৯৮০ সালের পর থেকে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে মানুষের শরীরে অনুভূত তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর ফলে ডায়রিয়া, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি ও হিটস্ট্রোকের মতো অসুখের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
এছাড়া গরমজনিত মানসিক সমস্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। হতাশা ও উদ্বেগের মতো মানসিক স্বাস্থ্য সংকট বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে গ্রীষ্মকালে। নারীরা তীব্র গরমে তুলনামূলক বেশি অসুস্থ হচ্ছেন। গ্রীষ্মকালে ডায়রিয়া ও কাশির হার শীতকালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। আবার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হতাশা বাড়ছে এবং ৫০ থেকে ৬৫ বছর বয়সীদের মধ্যে উদ্বেগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি।
স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে। ২০২৪ সালে গরম-সম্পর্কিত শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কারণে ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। এর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় *১.৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ০.৪ শতাংশ।
রাজধানী ঢাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। জাতীয় গড়ের তুলনায় ঢাকার হিট ইনডেক্স বা গরমের মাত্রা বেড়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশ বেশি। ফলে এখানে কর্মক্ষমতা হ্রাস ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলকভাবে মারাত্মক রূপ নিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিষয়ক বিভাগীয় পরিচালক জঁ পেসমে বলেন, ‘অত্যধিক গরম কোনো মৌসুমি সমস্যা নয়। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা এবং সামগ্রিক সমৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তবে বাংলাদেশ যদি অভিযোজন সক্ষমতা কাজে লাগায় এবং খাতসমন্বিত পদক্ষেপ নেয়, তবে এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।’
প্রতিবেদনের সহলেখক ও বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অপারেশনস অফিসার ইফফাত মাহমুদ বলেন, ‘তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও উৎপাদনশীলতা হ্রাসের সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া গেছে। সঠিক নীতি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে সুস্থ জীবন ও টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।’
বিশ্বব্যাংক পরামর্শ দিয়েছে, তীব্র গরম মোকাবিলার জন্য জরুরি ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। স্বাস্থ্যখাতকে গরম-সম্পর্কিত রোগ মোকাবিলায় সক্ষম করা, নগর এলাকায় সবুজায়ন বৃদ্ধি, নির্ভুল আবহাওয়া ও স্বাস্থ্যতথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে নীতি প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা ও সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা ও অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।