
রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) জন্য অধিগ্রহণ করা ২০৫ বিঘা জমির হাজারো গাছ কেটে লুট করার অভিযোগ উঠেছে। যার বেশিরভাগই কাটা হয়েছে গত এক মাসে।
এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে বালু ভরাটের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘হোসাইন কন্সট্রাকশন লিমিটেড’কে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গাছ কাটার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সূত্রগুলো বলছে, প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার গাছ থাকা ক্যাম্পাসটিতে গত ১০ মাস ধরেই বিক্ষিপ্তভাবে গাছ কাটা চলছিল। তবে মাসখানেক ধরে ব্যাপক হারে গাছ কেটে ট্রলিতে করে বাইরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে। গাছ কাটার জন্য কোনো দরপত্র বা কার্যাদেশ না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়।
এ বিষয়ে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক এবং রামেবির পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক প্রকৌশলী সিরাজুম মুনীর বলেন, “গাছ আমাদের পক্ষ থেকে কাটা হয়নি। গাছ কাটা হয়েছে ঠিকাদারের পক্ষ থেকে অনিয়মতান্ত্রিক ও বেআইনিভাবে। আমরা তাকে প্রাথমিকভাবে শোকজ করেছি। তাদের জবাবের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, “আমি জড়িত থাকলে তো শোকজ করতাম না। আমাদের চুক্তিতে এমন কিছু নেই যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বালু ভরাট করতে এসে গাছ কাটবে।”
তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হোসাইন কন্সট্রাকশনের রাজশাহীর ব্যবস্থাপক দেলোয়ার হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা গাছ কাটিনি। যেদিকে গাছ কাটা হয়েছে, সেদিকে আমাদের কোনো কাজ নেই। বন বিভাগের লোকজনকেও আমরা একই কথা বলেছি।”

বুধবার বিকেলে সরেজমিনে ক্যাম্পাস এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অসংখ্য কাটা গাছের গোড়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কোথাও মাটিচাপা দিয়ে চিহ্ন ঢাকার চেষ্টা করা হয়েছে, আবার কোথাও মাটি খুঁড়ে গাছ তোলায় বৃষ্টির পানি জমে ছোট পুকুরের মতো তৈরি হয়েছে। একটি জায়গায় গাছ কেটে ফাঁকা করে সেখানে পুঁইশাকের আবাদও দেখা গেছে।
ক্যাম্পাসের পশ্চিম দিকে প্রায় ১০ বিঘা আয়তনের একটি বাগানে সারি সারি গাছ কাটা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। হাঁটুসমান পানিতে ডুবে থাকা অসংখ্য গাছ ছিল, কিন্তু পানির কারণে সেগুলো সরানো সম্ভব হয়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ববিতা বেগম বলেন, “গত একমাস ধরে গাছ কাটছেই। ট্রলির ট্রলি গাছ এখান থেকে কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমরা ভেবেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই গাছ বিক্রি করে দিয়েছে।”
শারমিন বেগম নামে আরেকজন জানান, সবশেষ মঙ্গলবার সকালেও দুই ট্রলি গাছ কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

অভিযোগের আঙুল কর্মকর্তাদের দিকেও
বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সূত্র দাবি করেছে, এই গাছ কাটার পেছনে একটি চক্র জড়িত। এর সঙ্গে বালু ভরাটের ঠিকাদার, ক্যাম্পাসের অলিখিত তত্ত্বাবধায়ক হাফিজুল ইসলাম, একজন রাজনৈতিক নেতা, রামেবির রেজিস্ট্রার অধ্যাপক হাসিবুল হোসেন এবং উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী নাজমুল হোসেনের নাম উঠে এসেছে।
সূত্রটির দাবি, উপপ্রকল্প পরিচালক সিরাজুম মুনীরসহ শীর্ষ কর্মকর্তারাও আগে থেকে বিষয়টি জানতেন। হাফিজুল ইসলাম এ বছর আমের মৌসুমে বাগান থেকে প্রায় ৪০ লাখ টাকার আম বিক্রি করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে রেজিস্ট্রার অধ্যাপক হাসিবুল হোসেন বলেন, তিনি ‘অনঅফিসিয়ালি’ বিষয়টি শুনেছেন, কিন্তু প্রকল্প এলাকায় তিনি যান না। তাই তার নাম কেন আসছে, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী নাজমুল হোসেনও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, এ ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না।
এসব বিষয়ে কথা বলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোহা. জাওয়াদুল হকের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি।