
কখনো পরিচিত ছিল ‘বাগানের শহর’ নামে, আজ সেই পরিচয় কেবল ইতিহাসের পাতায়—এটাই এখনকার ঢাকা। এক সময় সবুজ গাছপালা আর খোলামেলা পরিবেশে ঠাসা রাজধানী শহরটি এখন পরিণত হয়েছে কংক্রিটের জঙ্গলে। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ও জনবহুল মেগাসিটির তালিকায় জায়গা করে নেওয়া ঢাকা আধুনিকতার রূপ ধারণ করলেও হারিয়েছে তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বাসযোগ্যতা ও পরিবেশগত ভারসাম্য।
আজকের ঢাকায় যেদিকেই তাকানো হয়, চোখে পড়ে কেবল সুউচ্চ ভবন, নির্মাণাধীন স্থাপনা আর কারখানার কোলাহল। নগর উন্নয়নের নামে কাটা পড়েছে হাজার হাজার গাছ। এক সময়ের সবুজ নগরী এখন হাঁসফাঁস করা এক দমবন্ধ শহরে রূপ নিয়েছে।
পরিকল্পনার অভাবে হারাচ্ছে প্রাণ
পরিবেশবিদরা বলছেন, ১৯৮০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া দ্রুত নগর সম্প্রসারণ পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে আজকের এই বাস্তবতা। উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় ছিল চরম অবহেলা। ফলে নাগরিক সুবিধা বাড়লেও কমেছে গাছপালা ও উন্মুক্ত স্থান।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, আধুনিক জীবনের চাহিদা মেটাতে গিয়ে ঢাকায় দখল করে নিয়েছে এসি, গাড়ি, কংক্রিট—যার প্রতিফলন ঘটেছে বায়ুমান ও তাপমাত্রার দিকেও। শহরের ঘরবাড়ি ও অফিসে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের ব্যবহার বাড়লেও গাছপালা কমে যাওয়ায় প্রাকৃতিক শীতল বাতাসের প্রবাহ একরকম বন্ধই হয়ে গেছে।
পরিবেশের অবনতিতে ঝুঁকি বাড়ছে
সবুজ কমে যাওয়ার ফলে ঢাকায় তাপমাত্রা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে, বায়ুমান নেমেছে বিপজ্জনক পর্যায়ে। ঢাকার বাতাস বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় নিয়মিত অবস্থান করছে। অন্যদিকে, গাছ না থাকায় বৃষ্টির পানি ধরে রাখার প্রাকৃতিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় নগরে জলাবদ্ধতাও বেড়ে গেছে।
বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় শহর এলাকায় সবুজায়নের গুরুত্ব বারবার উঠে আসছে। কিন্তু ঢাকায় সবুজ সংরক্ষণ নয়, বরং নির্মাণের নামে গাছ কেটে ফেলার ঘটনাই বেশি চোখে পড়ে।
ভবিষ্যতের জন্য কি প্রস্তুত ঢাকা?
নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশ সচেতন নাগরিকরা বলছেন, এখনই ঢাকায় সবুজ ফেরানোর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে শহরটি আরও অস্বাস্থ্যকর, বসবাসের অযোগ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। পরিকল্পিত সবুজায়ন, খোলা জায়গা সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন কার্যক্রমের বিকল্প নেই।
নগরায়ন হোক আধুনিক, কিন্তু প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে নয়—এই বার্তা তুলে ধরতে এখন প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। তা না হলে এক সময়কার ‘বাগানের শহর’ নামটি শুধু নস্টালজিয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।