ঢাকামঙ্গলবার , ৩ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

হিমালয়ে বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা, ঝুঁকির মুখে প্রায় ৩ লাখ মানুষ

প্রতিবেদক
বিপ্লব হোসাইন
৩ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৪১ সকাল

Link Copied!

জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহের বরফ গলে যাওয়া এবং পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির পরিবর্তনে হিমালয় অঞ্চলে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে নদী ও জলপ্রবাহের কাছাকাছি এলাকায় বসতি ও অবকাঠামো গড়ে ওঠায় সম্ভাব্য বিপর্যয়ের সংস্পর্শে থাকা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, নেপাল, ভারত ও চীনের হিমালয়-সংলগ্ন নির্দিষ্ট নদী অববাহিকায় প্রায় ২ লাখ ৯৩ হাজার ৮০০ মানুষ সম্ভাব্য বন্যার সংস্পর্শে থাকা এলাকায় বসবাস করছেন।

গত ৮ অক্টোবর বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্টিফিক রিপোর্টস-এ প্রকাশিত ‘Increasing exposure to potential flooding in high-mountain catchments’ শীর্ষক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি করেছেন সি. স্কট ওয়াটসন ও তাঁর সহগবেষকেরা।

গবেষণায় নেপাল এবং ভারতের ও চীনের সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ-হ্রদসংলগ্ন নদী অববাহিকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। নদীখাত থেকে উল্লম্বভাবে ৫০ মিটারের মধ্যে থাকা এলাকাকে সম্ভাব্য বন্যার সংস্পর্শে থাকার একটি সূচক হিসেবে বিবেচনা করেছেন গবেষকেরা। তাঁদের হিসাবে, ২০২৬ সালে এসব এলাকায় বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৯৩ হাজার ৮০০, যা গবেষণার আওতাভুক্ত অববাহিকার মোট জনসংখ্যার ১৮ শতাংশ।

তবে এই সংখ্যা সরাসরি বন্যায় আক্রান্ত বা নিশ্চিতভাবে বিপর্যয়ের মুখে থাকা মানুষের হিসাব নয়। নদীখাতের কাছাকাছি অবস্থানের ভিত্তিতে সম্ভাব্য বন্যার সংস্পর্শে থাকা জনসংখ্যা নিরূপণ করা হয়েছে। গবেষকেরা তাঁদের হিসাবের অনিশ্চয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে নদীখাতের উল্লম্ব ৫০ মিটারের মধ্যে থাকা ভবনগুলোর মোট আয়তন ৪৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। ১২ দশমিক ৩৮ বর্গকিলোমিটার থেকে বেড়ে তা হয়েছে ১৮ দশমিক ০৪ বর্গকিলোমিটার। অন্যদিকে, হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যার (জিএলওএফ) উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা এলাকায় ভবনের আয়তন বেড়েছে ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

নেপালের ক্ষেত্রে গবেষকেরা হিসাব করেছেন, ২০২৬ সালে হিমবাহ-হ্রদের প্রবাহপথসংলগ্ন সম্ভাব্য বন্যাপ্রবণ এলাকায় প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার ৫০০ মানুষ বসবাস করছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ২২ হাজার ৮০০ মানুষ নদীখাতের উল্লম্ব ১০ মিটারের মধ্যে রয়েছেন। গবেষণার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে নদীখাতের ৫০ মিটারের মধ্যে থাকা সম্ভাব্য বন্যার সংস্পর্শে থাকা জনসংখ্যা আরও ১৭ হাজার ৯০০ বা ৬ শতাংশ বাড়তে পারে।

হিমালয়-কারাকোরাম অঞ্চলে হিমবাহ গলে নতুন হিমবাহ-হ্রদ তৈরি এবং পুরোনো হ্রদের আয়তন বাড়ার কারণে জিএলওএফের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি এনপিজে ন্যাচারাল হ্যাজার্ডস-এ প্রকাশিত একটি পর্যালোচনা গবেষণায় এ অঞ্চলে অতীতে ৩৮৮টি জিএলওএফ ঘটনার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, হিমবাহের পশ্চাদপসরণ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই গবেষণায় হিমবাহ-হ্রদের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ মানুষের বসবাসের হিসাব দেওয়া হয়েছে। তবে এটি ২ লাখ ৯৩ হাজার ৮০০ মানুষের হিসাবের চেয়ে ভিন্ন ভৌগোলিক পরিসর ও পদ্ধতির পরিমাপ।

হিমালয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক বিপর্যয়ও ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে। গত ২৬ আগস্ট নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে লাংটাং লিরুং পর্বতের একটি অংশ থেকে বিপুল পরিমাণ শিলা ও হিমবাহের বরফ ধসে পড়ে। আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্র (আইসিআইএমওডি) ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে জানায়, এ ঘটনায় আনুমানিক ১৩ কোটি ২০ লাখ ঘনমিটার শিলা ও বরফ বিচ্ছিন্ন হয়ে নিচে নেমে আসে।

আইসিআইএমওডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ঘটনাটি প্রচলিত অর্থে হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা ছিল না। বরং পাহাড়ের শিলাস্তর ধসে তার সঙ্গে হিমবাহের বরফও ভেঙে পড়ে। এর ফলে শিলা, বরফ, পানি ও পলি মিশে দ্রুতগতির ধ্বংসাত্মক ঢল তৈরি হয়। সংস্থাটি নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, এ ঘটনায় নেপালে অন্তত ১ হাজার ৪৫১ জন নিহত এবং ৫ হাজার ৭৪৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। চীনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে তিব্বতে নিহত হয়েছেন ৪৩ জন এবং নিখোঁজ ৫১৯ জন।

আইসিআইএমওডি আরও জানিয়েছে, স্যাটেলাইটের রাডার পর্যবেক্ষণে ধসের আগে ৭ জুলাই থেকে ২৪ আগস্টের মধ্যে পাহাড়ের ওই অংশে সর্বোচ্চ ৪০ সেন্টিমিটার ভূমির স্থানচ্যুতি ধরা পড়েছিল। ধসের পর সৃষ্ট ঢল প্রায় সাত মিনিটের মধ্যে সীমান্ত এলাকার করিডরে পৌঁছে যায়। অথচ মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠানো হয় সকাল ৯টা ১৫ থেকে ৯টা ১৬ মিনিটের দিকে, অর্থাৎ ওই এলাকা ঢলে আক্রান্ত হওয়ার প্রায় ২৫ থেকে ৩০ মিনিট পরে। গবেষকদের মতে, বৃষ্টিপাত ও নদীর পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণনির্ভর প্রচলিত সতর্কব্যবস্থা আকস্মিক পাহাড়ধসের মতো বিপর্যয় শনাক্ত করার জন্য যথেষ্ট নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চলের ঝুঁকি শুধু হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হিমবাহের পরিবর্তন, পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়া, পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক দুর্বলতা এবং অতিবৃষ্টির মতো বিষয় একসঙ্গে কাজ করে আকস্মিক বন্যা, বরফধস ও ভূমিধসের মতো বিপর্যয় ঘটাতে পারে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কবার্তা এবং সীমান্তবর্তী দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় জোরদার করা জরুরি।

হিমালয় থেকে উৎপত্তি হওয়া গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলো বাংলাদেশেও প্রবেশ করেছে। ফলে উজানের পাহাড়ি অববাহিকায় বড় ধরনের বন্যা বা ধসের ঘটনা নদীর প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে গবেষণায় উল্লেখ করা ২ লাখ ৯৩ হাজার ৮০০ মানুষের হিসাব বাংলাদেশের জন্য সরাসরি বন্যার পূর্বাভাস নয়। বাংলাদেশের ওপর কোনো নির্দিষ্ট প্রভাব পড়বে কি না, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট নদী অববাহিকা, পানিপ্রবাহ ও ঘটনার প্রকৃতির ওপর।

তথ্যসূত্র: সায়েন্টিফিক রিপোর্টস, আইসিআইএমওডি ও এনপিজে ন্যাচারাল হ্যাজার্ডস।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

সাহারা মরুভূমিতে মিলল ৪১০ কোটি বছরের পুরোনো মঙ্গল গ্রহের উল্কাপিণ্ড

৩৫ উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা

ভালো ফলন ও দামে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাটচাষিদের মুখে হাসি

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল তরুণ ইনফ্লুয়েন্সার জেজুনের

হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক-নার্স সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

সময়মতো ন্যায্যমূল্যে কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর নির্দেশ কৃষিমন্ত্রীর

৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকায় পদ্মা ব্যারাজ, বদলে যাবে ১৯ জেলার চিত্র?

বাইন্যান্সের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে ৬৩০ কোটি ডলার চুরি, নেপথ্যে কারা?

শুঁটকিতেও মিলল বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক: শীর্ষে লইট্টা ও চিংড়ি

যুদ্ধে বিপর্যস্ত কৃষ্ণসাগর: সাড়ে ৪ বছরে ১ লাখ ২০ হাজার ডলফিনের মৃত্যু

সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জীবন বাঁচাতে তরুণদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও সিপিআর প্রশিক্ষণ

হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় দুই শিশুর মৃত্যু