
বাঙালির খাদ্যাভ্যাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত জনপ্রিয় খাবার শুঁটকি মাছে মিলেছে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক (ক্ষুদ্র প্লাস্টিক) কণার উপস্থিতি। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) মৎস্যবিদ্যা বিভাগের গবেষকদের এক গবেষণায় দেশের বিভিন্ন উপকূল থেকে সংগৃহীত শুঁটকিতে অন্তত সাত ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে।
দেশের চার উপকূলীয় অঞ্চল থেকে সংগৃহীত ছয় প্রজাতির শুঁটকির ২৪টি নমুনার প্রতিটিতেই এই প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি পাওয়ায় দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ওপর এক বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘মেরিন পলিউশন বুলেটিন’-এ গবেষণার এই ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।

চবির মৎস্যবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আজম খানের নেতৃত্বে এই গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষণার জন্য দেশের প্রধান চারটি শুঁটকি উৎপাদন ও বিপণন কেন্দ্র—কক্সবাজার, টেকনাফ, সুন্দরবনের দুবলার চর এবং কুয়াকাটা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
পরীক্ষায় লইট্টা, ছুরি, পোয়া, ফাইস্যা, হরিণা চিংড়ি ও বাগদা চিংড়ি—এই ছয় প্রজাতির শুঁটকি মাছের নমুনা যাচাই করা হয়। গবেষণায় প্রতিটি নমুনার ১০ গ্রাম শুকনা অংশ পরীক্ষা করে প্রতি গ্রামে শূন্য দশমিক ২৫ থেকে ১ দশমিক ৩০টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
যেখানে দূষণ সবচেয়ে বেশি :
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে সুন্দরবনের দুবলার চরের লইট্টা শুঁটকিতে, যেখানে প্রতি গ্রামে কণার পরিমাণ ১ দশমিক ৩০টি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কণা মিলেছে কক্সবাজারের বাগদা চিংড়ির শুঁটকিতে (১ দশমিক ২৫টি)।
এলাকাভিত্তিক গড় হিসাবে সুন্দরবনের শুঁটকিতে প্রতি গ্রামে গড়ে শূন্য দশমিক ৯১টি কণা পাওয়া গেছে, যা চার অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপরেই রয়েছে কক্সবাজার (০.৮২টি), কুয়াকাটা (০.৫৮টি) এবং টেকনাফ (০.৫৭টি)। তবে গবেষকরা জানিয়েছেন, এই সংখ্যার সামান্য তারতম্যের কারণে কোনো একটি এলাকার শুঁটকিকে পুরোপুরি নিরাপদ বা নিশ্চিতভাবে বেশি দূষিত বলার সুযোগ নেই, কারণ প্রতিটি অঞ্চলেই দূষণ রয়েছে।
৭ ধরনের প্লাস্টিক ও রাসায়নিক ঝুঁকি :
শুঁটকিতে শনাক্ত হওয়া কণাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মিলেছে সাধারণ পলিথিন (৩০.৪৯ শতাংশ) এবং পলিপ্রোপিলিন (২৪.৩৯ শতাংশ)। এ ছাড়া পলিয়েস্টার, পলিস্টাইরিন ও পলিভিনাইল ক্লোরাইডের (পিভিসি) মতো ক্ষতিকর উপাদানও পাওয়া গেছে। মাছের শুঁটকিতে পাওয়া এসব কণার বেশিরভাগই সূক্ষ্ম সুতার মতো কিংবা ছোট ভাঙা টুকরা, যার আকার সাধারণত ১৫১ থেকে ১ হাজার ৫০০ মাইক্রোমিটারের মধ্যে। কণাগুলোর রঙে নীল ও কালোর আধিক্য দেখা গেছে।
প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আশরাফুল আজম খান জানান, শুধু কণার সংখ্যা দিয়ে চূড়ান্ত ঝুঁকি নির্ধারণ করা যায় না; প্লাস্টিকগুলো কোন রাসায়নিক উপাদানে তৈরি, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ‘পলিমার হ্যাজার্ড ইনডেক্স’ বা ঝুঁকিসূচক অনুযায়ী, সুন্দরবনে কণার সংখ্যা বেশি হলেও রাসায়নিক ঝুঁকির দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে কুয়াকাটা। কুয়াকাটার শুঁটকির ঝুঁকিসূচক ২ হাজার ৬৪২ দশমিক ৭ এবং কক্সবাজারে ১ হাজার ৪৬১ দশমিক ১। এর মূল কারণ হলো, এসব অঞ্চলের নমুনায় পলিভিনাইল ক্লোরাইড ও পলিস্টাইরিনের মতো অধিক বিপদাপন্ন প্লাস্টিকের উপস্থিতি বেশি।
যেভাবে শুঁটকিতে প্রবেশ করছে প্লাস্টিক :
উপকূলীয় অঞ্চলে যত্রতত্র ফেলা পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য পচে না গিয়ে ক্ষুদ্র কণায় রূপ নিয়ে সমুদ্রের পানি ও নদীর মোহনায় মিশে যাচ্ছে। সামুদ্রিক মাছ খাবার মনে করে এসব কণা গিলে ফেলছে, যা পরবর্তীতে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের পেটে যাচ্ছে।
পাশাপাশি মাছ শুকানোর সনাতন পদ্ধতিও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। মাছ শুকানোর খোলা চত্বরে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের রশি, ছেঁড়া জাল, পলিথিন, এবং বাজারজাতকরণের সময় ব্যবহৃত মোড়ক থেকে ঘর্ষণের মাধ্যমে শুঁটকিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক যুক্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও করণীয় :
গবেষকেরা বলছেন, শুঁটকি খাওয়ার মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্লাস্টিক কণা প্রবেশের ফলে দীর্ঘমেয়াদে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, অঙ্গহানি কিংবা কোষীয় জটিলতার মতো বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যদিও মানুষের দেহে এর নির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব জানতে আরও গভীর গবেষণা প্রয়োজন, তবে সেই প্রহর না গুনে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
খাদ্যশৃঙ্খল ও সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষায় উপকূলীয় এলাকায় প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি নজরদারি বাড়ানো, আধুনিক ও নিরাপদ উপায়ে মাছ শুকানোর ব্যবস্থা করা এবং উৎপাদনকারীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা।