ঢাকাসোমবার , ২ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

যুদ্ধে বিপর্যস্ত কৃষ্ণসাগর: সাড়ে ৪ বছরে ১ লাখ ২০ হাজার ডলফিনের মৃত্যু

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
২ নভেম্বর ২০২৬, ১০:২৮ সকাল

Link Copied!

ইউক্রেনে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের বিষাক্ত প্রভাব শুধু মানুষের প্রাণহানি কিংবা স্থলভাগের ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; তা ভয়াবহ আকারে আঘাত হেনেছে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ও বন্যপ্রাণীর ওপর। রাশিয়ার আক্রমণ শুরুর পর থেকে সামরিক তৎপরতা, নৌযুদ্ধ ও শক্তিশালী শব্দদূষণের কারণে কৃষ্ণসাগরে (ব্ল্যাক সি) এ পর্যন্ত ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি ডলফিনের করুণ মৃত্যু হয়েছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, এই অভূতপূর্ব প্রাণহানি কৃষ্ণসাগরের সামুদ্রিক পরিবেশকে মারাত্মক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা পূর্বের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে অন্তত ৩০ থেকে ৫০ বছর সময় লাগবে।

ইউক্রেনের বিখ্যাত ‘তুজলি লাগুনস ন্যাশনাল নেচার পার্ক’-এর প্রধান গবেষক ও পরিবেশবিজ্ঞানী ইভান রুসেভ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই আশঙ্কাজনক তথ্য প্রকাশ করেন। তার হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধে এ পর্যন্ত যে পরিমাণ ডলফিন ও সেটাসিয়ান (তিমি-জাতীয় সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী) মারা গেছে, তা কৃষ্ণসাগরে বসবাসকারী মোট ডলফিন ও তিমি প্রজাতির প্রায় এক-চতুর্থাংশ বা ২৫ শতাংশ।

যুদ্ধে বিপন্ন সামুদ্রিক পরিবেশ :
পরিবেশবিদদের মতে, যুদ্ধের আগে কৃষ্ণসাগরে ডলফিনের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি ছিল চোরাশিকারিদের অবৈধ নেট বা ফিশিং ট্রলারের জাল। সে সময় জালে আটকে দমবন্ধ হয়ে বহু ডলফিন মারা যেত। কিন্তু ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর উপকূলীয় অঞ্চলে মাছ ধরা ও চোরা শিকার অনেকটাই কমে যায়। তবে নৌযুদ্ধের তীব্রতা এবং সাগরে সামরিক সরঞ্জামের অতিব্যবহার সামুদ্রিক প্রাণীদের জন্য জালের চেয়েও শতগুণ বেশি ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০২২ সালে যুদ্ধের প্রথম বছরেই প্রায় ৫০ হাজার ডলফিনের মৃত্যু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

তীরে ভেসে আসা ডলফিনের মৃতদেহগুলো পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সেগুলোর শরীরে জালে আটকানোর কোনো চিরাচরিত ক্ষত চিহ্ন নেই। বরং সিংহভাগ ডলফিনই চরম পুষ্টিহীনতা ও অনাহারে ভুগে মারা গেছে।

ইকোলোকেশন ধ্বংস ও অনাহারে মৃত্যু :
বিজ্ঞানীরা জানান, নৌযুদ্ধে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামরিক প্রযুক্তিই ডলফিনের অনাহারে মৃত্যুর মূল কারণ। ডলফিন ও তিমি জাতীয় প্রাণীরা চলাফেরা, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ এবং শিকার খোঁজার জন্য ইকোলোকেশন (শব্দতরঙ্গ) ব্যবস্থার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। সাগরে বিচরণকারী সামরিক জাহাজের শক্তিশালী সোনোয়ার, সাবমেরিন ধ্বংসকারী চার্জ, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ এবং শক্তিশালী আন্ডারওয়াটার বিস্ফোরণ সাগরের নিচে বিকট শব্দতরঙ্গ তৈরি করছে।

এই বিকট শব্দ ও সোনারের উচ্চ কম্পন ডলফিনের অতি সংবেদনশীল শ্রবণেন্দ্রিয় ধ্বংস করে দিচ্ছে এবং তাদের ইকোলোকেশন ক্ষমতা নষ্ট করে দিচ্ছে। ফলে পানির নিচে দিকবিদিক শূন্য হয়ে পড়ে ডলফিনগুলো অন্ধের মতো সাঁতরাতে থাকে। শিকার ধরতে না পেরে তারা দ্রুত ওজন ও শক্তি হারাতে থাকে।

বিষাক্ত পদার্থের সংক্রমণ ও রোগব্যাধি :
খাদ্যের অভাবে ডলফিনের শরীরে জমে থাকা চর্বি দ্রুত পুড়তে শুরু করে। পরিবেশবিজ্ঞানীরা জানান, গৃহস্থালি ও কৃষিকাজের বিষাক্ত রাসায়নিক, মেটাল ও মাইক্রোপ্লাস্টিক বর্জ্য সামুদ্রিক পানির মাধ্যমে ডলফিনের চর্বির স্তরে জমা হয়ে থাকে। খাবার না পেয়ে যখন দেহের চর্বি গলতে শুরু করে, তখন এই জমাকৃত বিষাক্ত পদার্থ সরাসরি তাদের রক্তে মিশে যায়।

এর ফলে ডলফিনের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারে ধ্বংস হয়ে পড়ে। অতি সহজেই তারা নানা ধরনের মারণ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। বিশেষ করে ‘মরবিলিভাইরাস’ নামক একটি প্রাণঘাতী ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে শ্বাসকষ্টে ডলফিনগুলো ছটফট করে মারা যাচ্ছে। বুলগেরিয়া, রোমানিয়া ও তুরস্কের উপকূলেও প্রতিনিয়ত এই জাতীয় মৃত ডলফিন ভেসে আসছে।

ডুবে যাওয়া যুদ্ধজাহাজ ও তেল দূষণ :
সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য দ্বিতীয় বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে সাগরে ডুবে যাওয়া সামরিক নৌযান ও সাবমেরিনগুলো। ইউক্রেনীয় বিমান ও ড্রোনের হামলায় এ পর্যন্ত রাশিয়ার বিখ্যাত ক্রুজার ‘মস্কভা’সহ প্রায় ৩০টি যুদ্ধজাহাজ এবং দুটি সাবমেরিন কৃষ্ণসাগরে ডুবে গেছে।

ডুবে যাওয়া এসব জাহাজে থাকা হাজার হাজার টন ব্যবহৃত পেট্রোলিয়াম, জ্বালানি তেল ও অন্যান্য মারাত্মক রাসায়নিক তরল পদার্থ সাগরের পানিতে মিশে যাচ্ছে। এই ক্ষতিকর তেল ও কেমিক্যাল সাগরের তলদেশের শেওলা ধ্বংস করছে এবং স্টার্জনসহ নানা প্রজাতির মাছ ও সামুদ্রিক জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকা কঠিন করে তুলছে।

কখোভকা বাঁধ বিপর্যয় ও রাসায়নিকের স্রোত :
২০২৩ সালে ইউক্রেনের ঐতিহাসিক ‘কখোভকা হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার প্ল্যান্ট’ বা কখোভকা বাঁধ ধ্বংসের ঘটনা পরিবেশের ওপর আরেক বিরাট ধাক্কা হিসেবে আবির্ভূত হয়। বাঁধ ভাঙার ফলে জলাধার থেকে প্রায় ১৮ ঘনকিলোমিটার বিষাক্ত পানি হু হু করে সাগরে এসে পড়ে।

এই পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ শিল্পবর্জ্য, সারের কেমিক্যাল, ভারী ধাতু এবং মবিল-ইঞ্জিন অয়েল সাগরে মিশে গেছে। এটি কৃষ্ণসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলের পানিকে দীর্ঘদিন ধরে দূষিত করে রেখেছে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলছে।

পাখি ও স্থলজ প্রাণীর ওপর প্রভাব :
যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব কেবল সাগরেই সীমাবদ্ধ নেই, আকাশ ও স্থলেও এর ছাপ স্পষ্ট। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে যাতায়াতকারী লাখ লাখ পরিযায়ী পাখি যুদ্ধের কারণে পথ হারাচ্ছে। ড্রোনের শব্দ ও মিসাইল বিস্ফোরণের আতঙ্কে অনেক পাখি তাদের গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ক্লান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। তুজলি লাগুনসে বংশবৃদ্ধি করতে আসা দুর্লভ প্রজাতির ফ্লেমিঙ্গো পাখিরা ভয়ে নিজেদের ডিম ফেলে পালিয়ে যাচ্ছে এবং সেই ডিমগুলো গাংচিলের খাদ্যে পরিণত হচ্ছে।

তবে যুদ্ধের কারণে মানুষের শিকারি তৎপরতা বন্ধ থাকায় স্থলভাগে কিছু বন্যপ্রাণী যেমন—বুনো শুকর, হরিণ, শেয়াল, খরগোশ ও ব্যাজারের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে।

দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত ক্ষতি :
বিজ্ঞানীদের মতে, যুদ্ধের পর স্থলভাগের পোকা-মাকড় ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীরা নিজেদের জনসংখ্যা কয়েক বছরের মধ্যে পুনর্বাসিত করতে পারলেও সামুদ্রিক প্রাণীদের ক্ষেত্রে তা মোটেও সহজ নয়।

পরিবেশবিজ্ঞানী ইভান রুসেভ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের হিসাব ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কৃষ্ণসাগরের বিলুপ্তপ্রায় ডলফিন ও তিমির প্রজাতিগুলোকে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে এবং এর সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে পুনরায় সুস্থ ও স্বাভাবিক করে তুলতে অন্তত ৩০ থেকে ৫০ বছর নিরবচ্ছিন্ন সময় লাগবে।’

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা / কোরাবেলোভ ইনফো

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় দুই শিশুর মৃত্যু

কৃষকের কাছে সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছানোর তাগিদ কৃষিমন্ত্রীর

Tourism Fair Concludes with Tk 43 Crore in Business Over Three Days

তিন দিনে ৪৩ কোটি টাকার ব্যবসা, শেষ হলো পর্যটন মেলা

দুই ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর চালু হলো মিরপুরের তিন মেট্রোরেল স্টেশন

ডুমুরিয়ায় বর্জ্য থেকে তৈরি হবে জৈব সার ও মাছের খাবার

বাসের রং দেখেই চেনা যাবে ঢাকার কোন রুটে চলছে

দুই দিনে ভরিতে সোনার দাম কমল ৭ হাজার টাকা, ভরি কত?

মাতারবাড়ীতে ৭০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ

আগামী সংসদ অধিবেশনেই ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ আইন পাস হবে: বিদ্যুৎমন্ত্রী

ঢাকায় ৬ রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাস চলাচল শুরু, নামছে ৮১৬টি বাস

সুন্দরবনে মাছের মজুদ বাড়লেও হুমকিতে ৬ প্রজাতি