ঢাকারবিবার , ২৮ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

“মৃত্যুর পর কি আছে? — বিভিন্ন দেশের মানুষের বিশ্বাস ও মনস্তত্ত্ব”

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
৩০ জুলাই ২০২৫, ৩:৩০ বিকাল

Link Copied!

রাতের আকাশ জুড়ে অসংখ্য তারা ঝলমল করছে। একসময় মানুষ এই আকাশের তারাদের দিকে তাকিয়ে জীবন ও মৃত্যুর রহস্য নিয়ে নানা প্রশ্ন করত। “আমরা কোথা থেকে এসেছি? মৃত্যুর পর কি থাকে?”—এমন প্রশ্নগুলো মানুষের মনকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। প্রাচীনকাল থেকে আজও এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে মানুষ নানা ধর্ম, দার্শনিক চিন্তাভাবনা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে চেষ্টা করে এসেছে বুঝতে, জীবনের পরবর্তী অস্তিত্ব আছে কি না। বর্তমান বিশ্বে নানা দেশে মানুষের এই বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের মাত্রা কতটা ভিন্ন? সে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে “বিশ্ব মূল্যায়ন জরিপ” বা World Values Survey এর সাম্প্রতিক (২০১৭-২০২২) তথ্যানুযায়ী করা বিশ্লেষণ।

বাংলাদেশের এক গ্রামের ঘটনা দিয়ে শুরু করা যাক। গ্রামের ছোট্ট মসজিদের ইমাম হাফেজ আলী প্রতিদিন তার ভক্তদের উদ্দেশে জীবনের পরবর্তী সম্পর্কে গল্প করেন। তিনি বলেন, “মৃত্যু শেষ নয়, মৃত্যুর পর আমাদের আত্মা এক নতুন জীবনে প্রবেশ করে।” এই বিশ্বাসে গড়া সমাজে মানুষ মরণের পর জীবন নিয়ে আশাবাদী থাকে। গ্রামের বয়স্ক নারী সুমাইয়া বেগম বলেন, “আমি নিশ্চিত, মৃত্যু আমাদের শেষ নয়। আমার বাবার আত্মা আজও আমাদের আশেপাশে আছেন।” এই গ্রামের মতো বাংলাদেশের অন্যান্য জায়গায় এই বিশ্বাস প্রচণ্ড শক্তিশালী এবং জরিপের পরিসংখ্যানও সেটা প্রতিফলিত করে। বাংলাদেশে জীবনের পরবর্তী জীবনে বিশ্বাসের হার ৯৮.৮ শতাংশ, যা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থান।

বিশ্বের নানা জায়গায় এই বিশ্বাসের মাত্রা ভিন্নতার চিত্র বহুবিধ। মরক্কোতে ৯৬.২ শতাংশ মানুষ জীবনের পরবর্তী জীবনে বিশ্বাস করে। সেখানে মানুষের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে এই বিশ্বাস গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। লিবিয়া, তুরস্ক, ইরান, পাকিস্তান, মিশর এবং ফিলিপাইনসহ বেশ কিছু দেশেও এই বিশ্বাসের হার ৮০-৯৫ শতাংশের মধ্যে। এই দেশগুলোতে ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, এবং মৃত্যুর পরের জীবন নিয়ে ধারণাগুলো সমাজে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত।

তবে এতোই শুধু নয়, এই বিশ্বাসের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহ্যগত ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, মलेশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া-দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুটি প্রধান মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ যেখানে এই বিশ্বাস যথাক্রমে ৮১.৯ এবং ৭৩.৫ শতাংশ। যদিও এখানে ধর্মীয় বিশ্বাস প্রবল, তথাপি আধুনিকায়নের সঙ্গে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এখানকার নাগরিকরা জীবনের পরবর্তী জীবনে বিশ্বাস করলেও অন্যান্য জীবনধারার ক্ষেত্রে পার্থক্য প্রকাশ পায়।

আসন্ন সময়ে চিন্তা করা যায়, কেন কিছু দেশে এই বিশ্বাস এতই কম? যেমন চীন, যেখানে মাত্র ১১.৫ শতাংশ মানুষ মৃত্যুর পরের জীবনে বিশ্বাস করে। এখানে ধর্মীয় চিন্তাধারা অনেকটাই পার্থিব ও বৈজ্ঞানিক ধারণার সঙ্গে জড়িত। সাংস্কৃতিক বিপ্লব এবং ateism-এ জাতীয় নীতি চীনের জনসাধারণের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুশীলনকে সীমাবদ্ধ করেছে। চীন ছাড়াও জাপান, ভিয়েতনাম, রাশিয়া, স্পেন ও নরওয়ে তে জীবনের পরবর্তী জীবনে বিশ্বাসের হার তুলনামূলকভাবে কম।

জাপানে বিশ্বাসের হার ৩২.২ শতাংশ, যেখানে শিন্টো এবং বৌদ্ধ ধর্মের আধ্যাত্মিক দর্শন রয়েছে, কিন্তু আধুনিকতা ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি এর প্রভাব সুস্পষ্ট। ভিয়েতনামেও ৩৪.১ শতাংশ মানুষ মৃত্যুর পরের জীবনে বিশ্বাস রাখে, যেখানে পারিবারিক ও সামাজিক ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক ধারণা। ইউরোপের কিছু দেশ যেমন যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, স্পেন এবং রাশিয়ায় বিশ্বাসের হার ৪০ শতাংশের নিচে, যা পশ্চিমা বিশ্বের আধুনিকতা, বৈজ্ঞানিক মনোভাব ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রসারের পরিচায়ক।

আমেরিকার দুই প্রধান দেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা, যেখানে বিশ্বাসের হার যথাক্রমে ৬৮.২ ও ৫৬.৯ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে বহু ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা বিদ্যমান, এবং মানুষের মধ্যে মৃত্যুর পরের জীবনে বিশ্বাস এখনও অনেকাংশেই প্রবল। কানাডায় অবশ্য কিছুটা কম, সম্ভবত এর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে।

দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে আর্জেন্টিনা ও ভেনেজুয়েলায় বিশ্বাসের হার ৫৮.২ এবং ৫৭.২ শতাংশ। ব্রাজিলে এটি ৫৬.৭ শতাংশ, যেখানে ক্যাথলিক ধর্মের প্রভাব দীর্ঘদিন থেকে প্রবল। থাইল্যান্ডেও এই বিশ্বাস প্রায় ৫৭.১ শতাংশ, যা সেখানে বৌদ্ধ ধর্মের আধ্যাত্মিক দর্শনকে প্রভাবিত করে।

এই সব তথ্য থেকে বোঝা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের মৃত্যুর পরের জীবনে বিশ্বাসের মাত্রা সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ভিন্নতা প্রদর্শন করে। ধর্মবিশ্বাস, শিক্ষা, আধুনিকতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক পরিবর্তনের ওপরও এ বিষয়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।

বিশ্বাসের ওপর মানুষের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। মৃত্যুর পরের জীবনে বিশ্বাস মানুষকে মৃত্যুর ভয় থেকে মুক্তি দিতে সাহায্য করে। এই বিশ্বাস তাদের জীবনে মানসিক শান্তি ও আশার সঞ্চার করে। বিশেষ করে যখন জীবনে নানা দুঃখ-কষ্ট আসে, তখন আধ্যাত্মিক বিশ্বাস মানুষকে ধৈর্য ও শক্তি দেয়। এটা প্রমাণিত যে, এই বিশ্বাস মানুষের মানসিক সুস্থতার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অন্যদিকে, কিছু দেশ ও সমাজে যারা মৃত্যুর পর জীবনে বিশ্বাস রাখে না, তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জীবনকে প্রকৃত ও বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। এই দর্শনের মানুষরা মৃত্যুকে জীবনের শেষ অধ্যায় হিসেবে মেনে নেয় এবং বর্তমান জীবনের গুণগত মান বৃদ্ধিতে বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা বিশ্বাস করে, জীবনের একমাত্র সুযোগ এই পৃথিবীতে, তাই এটাই সবচেয়ে মূল্যবান। এই মনোভাব মানুষকে বাস্তববাদী এবং স্বাধীন চিন্তাবিদ হতে সাহায্য করে।

এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মাঝখানে রয়েছে নানা মিশ্রন ও ব্যতিক্রম। অনেক দেশ ও ব্যক্তিরা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করলেও, মৃত্যুর পরের জীবন নিয়ে সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য বিশ্বাস না করেও সাংস্কৃতিক কারণে তা অনুসরণ করেন। আবার অনেক দেশে আধুনিক শিক্ষা ও প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে আধ্যাত্মিক চিন্তাধারার নতুন নতুন রূপ তৈরি হচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী এই বিশ্বাসের প্রভাব কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক স্তরেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতা সমাজের নৈতিকতা, আচরণ, বিচারব্যবস্থা ও আইন প্রণয়নে প্রভাব ফেলে। অনেক দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পারিবারিক মূল্যবোধ মৃত্যুর পরের জীবনের ধারণার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইরান, মরক্কো, ইত্যাদি দেশে ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা সামাজিক নিয়ম-কানুন ও মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রবল প্রভাব ফেলে।

অন্যদিকে, পশ্চিমা দেশগুলোতে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বিজ্ঞানপ্রধান সমাজব্যবস্থা উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার প্রভাব হ্রাস পাচ্ছে। এর ফলে মৃত্যুর পরের জীবনে বিশ্বাসও অনেক কমে এসেছে। তবে এটির মানে এই নয় যে সেখানে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস; অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করেন, যদিও তা সামাজিক বা প্রকাশ্যে কম দেখা যায়।

আধুনিক প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে এসব বিশ্বাস ও মতাদর্শ আরও বৈচিত্র্যময় হচ্ছে। অনলাইনে মানুষের মতামত ও বিশ্বাস ভাগাভাগি করার মাধ্যমে এ বিষয়গুলো নিয়ে নতুন আলোচনা এবং বিতর্ক সৃষ্টি হচ্ছে। এ কারণে ভবিষ্যতে মৃত্যুর পর জীবনে বিশ্বাসের মাত্রা কেমন হবে, তা এখন থেকে বলা কঠিন।

সব মিলিয়ে, এই জরিপ ও বিশ্লেষণ আমাদেরকে শেখায় যে, মানুষের বিশ্বাসের ভিন্নতা তার সংস্কৃতি, ইতিহাস, শিক্ষা, ধর্ম ও সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। মৃত্যুর পরের জীবন নিয়ে মানুষের আশা, আশঙ্কা ও প্রশ্ন একেক সমাজে একেক রকম রূপ ধারণ করে।

বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শুরু করে বিশ্বের নানা দেশে মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ানো সেই আকাশের তারাদের গল্প আজও মানুষকে মৃত্যুর পরের রহস্য উন্মোচনে উদ্বুদ্ধ করে। যদিও আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না, তবে বিশ্বাসের আলোয় জীবন ও মৃত্যু যেন আরও অর্থবহ হয়ে উঠে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সহনশীলতায় গুরুত্ব দিয়ে শেষ হলো ফিনিক্স সামিট ২০২৬

পিকআপ-সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে মা-মেয়েসহ নিহত ৩

গ্যাস বেলুনে ১৫ মিনিট বন্ধ মেট্রোরেল

ঢাকাসহ ১২ জেলায় দুপুরের মধ্যে ঝড়-বৃষ্টির আভাস

বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের মেট্রোরেলে অর্ধেক ভাড়া

চালসহ নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রয়েছে: খাদ্য প্রতিমন্ত্রী

হামের উপসর্গে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু

Huawei Hiring Solar Power, Public Affairs and Enterprise Professionals

তিন পদে কর্মী খুঁজছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে

বাংলাদেশিদের জন্য ফের চালু ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা

রোববার শুরু ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন, ক্যাপসুল পাবে ২ কোটি ৩৫ লাখ শিশু

প্রতিবন্ধী শিশুদের স্বাস্থ্যসেবায় আসছে বিশেষ প্রকল্প, বাজেটে থাকছে আলাদা বরাদ্দ