
বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (ইউএইচসি) পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো দেশের ভৌগোলিক অবস্থানের চেয়ে তার অর্থনৈতিক অবস্থা ও জাতীয় আয়ের স্তরই সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলছে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোর তুলনায় নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা পাওয়ার হার ২১ শতাংশ কম। সম্প্রতি বিশ্বের ১৯৪টি দেশের ওপর পরিচালিত গবেষণায় এই চিত্র উঠে এসেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সাময়িকী প্লস গ্লোবাল পাবলিক হেলথ-এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।
জাপানের ইয়োকোহামা সিটি ইউনিভার্সিটির গবেষক আকিরা হায়াসাকার নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) এবং জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকের (এইচডিআই) বিস্তারিত ডেটা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে ‘ইউএইচসি সার্ভিস কাভারেজ ইনডেক্স’ (এসসিআই) ব্যবহার করা হয়েছে। প্রজনন ও মাতৃস্বাস্থ্য, সংক্রামক ব্যাধি, অসংক্রামক ব্যাধি এবং স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামোগত সক্ষমতা ও সুযোগ—এই চার প্রধান সূচকের ওপর ভিত্তি করে সূচকটি তৈরি হয়েছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, অর্থনৈতিক আয়ের পার্থক্যের কারণে সবচেয়ে বড় বৈষম্য দেখা গেছে সংক্রামক ব্যাধির প্রতিরোধ ও চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে সংক্রামক রোগের চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তির হার উচ্চ আয়ের দেশগুলোর চেয়ে ৩১ শতাংশ কম। একইভাবে হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য কাঠামোর প্রবেশগম্যতার (সার্ভিস ক্যাপাসিটি অ্যান্ড অ্যাকসেস) দিক থেকেও দারিদ্র্যপীড়িত দেশগুলো চরমভাবে পিছিয়ে রয়েছে।
তবে প্রজনন, মাতৃত্ব, নবজাতক ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার মতো জায়গাগুলোতে বৈশ্বিক বিভিন্ন দাতাসংস্থা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) কারণে আয়ের বৈষম্য কিছুটা কম পরিলক্ষিত হয়েছে। পাশাপাশি ক্যানসার বা হৃদরোগের মতো অসংক্রামক ব্যাধির চিকিৎসায় আয়ভিত্তিক ফারাক থাকলেও তা সংক্রামক রোগের মতো অতটা তীব্র নয়।
গবেষকরা দেখেছেন, একটি দেশের সার্বিক মানব উন্নয়ন সূচক (এইচডিআই) প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার মান ও সুযোগ বৃদ্ধি পাওয়ার হার সরাসরি সম্পর্কিত। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কোনো দেশের এইচডিআই সূচকে মাত্র ০.১ পয়েন্ট অগ্রগতি অর্জন হলে সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা কাভারেজ সূচকে ৬.৮ পয়েন্ট লাফ দেয়।
এর মধ্যে স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামো ও সক্ষমতার ওপর এইচডিআই বৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে, যেখানে সূচক বৃদ্ধি পায় প্রায় ১১.৭ পয়েন্ট। অন্যদিকে অসংক্রামক ব্যাধির ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির প্রভাব ছিল ২.২ পয়েন্ট।
যদিও গবেষণায় দেখা গেছে ভৌগোলিক অঞ্চলের চেয়ে অর্থনৈতিক ব্যবধানটাই বড়, তবুও আঞ্চলিক বৈষম্যের অস্তিত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশেষ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) আফ্রিকান অঞ্চলের দেশগুলোর স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো ও চিকিৎসাসুবিধা ইউরোপীয় অঞ্চলের দেশগুলোর চেয়ে এখনো অনেক নিচে অবস্থান করছে।
গবেষকরা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, এই গবেষণাটি জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের ডেটার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, তাই কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের ভেতরে ধনী-দরিদ্রের অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্য বৈষম্যের চিত্র এতে পুরোপুরি উঠে আসেনি।
তবে নীতিপ্রণেতাদের উদ্দেশে গবেষক দলটি জানিয়েছে, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সবার জন্য সাশ্রয়ী ও গুণগত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে কেবল হাসপাতাল তৈরি বা ওষুধ বরাদ্দ করাই যথেষ্ট নয়। শিক্ষা, দারিদ্র্য বিমোচন, সুপেয় পানি ও উন্নত জীবনযাত্রার মতো স্বাস্থ্য খাতের বাইরের সামগ্রিক সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন (হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট) নিশ্চিত করা না গেলে বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাসেবার এই বিশাল বৈষম্য কখনোই দূর করা সম্ভব হবে না।