
নিঃশব্দে জঙ্গলের বুক চিরে বয়ে যায় বাতাস। হরিণের পায়ের শব্দ থেমে যায়, পাখির ডানা গুটিয়ে নেয় নিরবতায়। অরণ্যের রাজা বের হয়েছে তার গোপন আস্তানা থেকে—এই তো সে, বনের বুকে এক নিঃসঙ্গ বাঘ। কিন্তু তার এই রাজত্ব আজ সংকটে। একসময় যাদের গর্জনে থরথর করত অরণ্য, আজ তাদের অস্তিত্বই যেন প্রশ্নের মুখে। বিশ্বজুড়ে বন্য বাঘের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে, আর এই পতনের পেছনে রয়েছে মানবসৃষ্ট নানা কারণ। এই প্রতিবেদনে আমরা বিশ্বব্যাপী বন্য বাঘের বর্তমান সংখ্যা, তাদের অবস্থান, এবং সংকটের কারণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মোট বন্য বাঘের সংখ্যা মাত্র ৪,৯৮৯টি। এই সংখ্যাটি শুনে হয়তো অনেকেই চমকে উঠবেন, কারণ পৃথিবীর বুকে এখন যেসব প্রাণীর অস্তিত্ব বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে, বাঘ তাদের অন্যতম। এক শতাব্দী আগে যেখানে বিশ্বজুড়ে প্রায় এক লাখ বাঘ ছিল, সেখানে আজ তাদের সংখ্যা প্রায় শতকরা ৫ ভাগে এসে ঠেকেছে।
বন্য বাঘের সর্বাধিক বাস ভারতের বনে। দেশটিতে বর্তমানে মোট ২,৯৬৭টি বন্য বাঘ রয়েছে, যা বিশ্বসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ। ভারতের সুন্দরবন, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ অরণ্য অঞ্চল আজও বাঘদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত। ভারত সরকার বাঘ সংরক্ষণে Project Tiger এর মতো প্রকল্প চালু করেছে, যা বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বন ও বাঘ সংরক্ষণের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি, ক্যামেরা ট্র্যাপ, এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
ভারতের পরে দ্বিতীয় স্থানে আছে রাশিয়া। সাইবেরিয়ার বরফে ঢাকা বনাঞ্চলে বাস করা সাইবেরিয়ান বাঘ বা অ্যামুর টাইগারের সংখ্যা বর্তমানে ৫৪০টি। রাশিয়ার কঠোর আইনি ব্যবস্থাপনা এবং অভয়ারণ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতির ফলে এই বিরল প্রজাতির বাঘদের টিকে থাকা এখনো সম্ভব হয়েছে। অ্যামুর টাইগার বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রজাতির বাঘ এবং এরা তীব্র শীতেও টিকে থাকতে পারে।
তৃতীয় স্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, যেখানে ৫০০টি বাঘের বাস। ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রান টাইগার আজও টিকে আছে, যদিও এর আত্মীয় বলি বাঘ (Bali Tiger) এবং জাভান টাইগার (Javan Tiger) ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সুমাত্রান টাইগারদের অস্তিত্ব আজও হুমকির মুখে রয়েছে, কারণ সেখানে বন উজাড় ও তেল পাম শিল্পের কারণে তাদের আবাসস্থল দ্রুত কমে যাচ্ছে।
নেপালে বর্তমানে বন্য বাঘের সংখ্যা ৩৫৫টি। তরাই অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ঘন বনাঞ্চলে এই বাঘদের বাস। নেপাল সরকার সম্প্রতি বাঘ সংরক্ষণের ব্যাপারে প্রশংসনীয় অগ্রগতি করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা WWF এর সহযোগিতায় দেশটি বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করতে সক্ষম হয়েছে ২০১০ সালের পর থেকে। বাঘ সংরক্ষণে সঠিক পরিকল্পনা ও জনগণের সম্পৃক্ততা যে কীভাবে কার্যকর হতে পারে, নেপাল তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
পরবর্তী দেশ থাইল্যান্ড, যেখানে ১৮৯টি বন্য বাঘ বাস করে। থাইল্যান্ডে অবস্থিত হুয়াই খা খা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও পশ্চিম থাইল্যান্ডের বনাঞ্চলগুলোতে এই বাঘদের দেখা যায়। তবে চোরাশিকার ও বনে মানুষের অবাধ প্রবেশ এই অঞ্চলে বাঘদের অস্তিত্ব হুমকির মধ্যে ফেলেছে।
মালয়েশিয়ায় বর্তমানে বাঘের সংখ্যা ১৫০টি। মালয়ান টাইগার নামে পরিচিত এই বাঘ প্রজাতি শুধু মালয় উপদ্বীপেই দেখা যায়। এই সংখ্যাটি এক দশক আগেও ছিল ৫০০’র বেশি, কিন্তু বন ধ্বংস ও চোরাশিকার এই হ্রাসের প্রধান কারণ। মালয়েশিয়া সরকার সংরক্ষণে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেও চোরাকারবারীদের থামানো এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের বনে বাঘের সংখ্যা বর্তমানে ১০৬টি। সুন্দরবনের গহীন অরণ্যেই এই বাঘদের একমাত্র বাস। বাংলাদেশ বন বিভাগ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা মিলে বাঘ সংরক্ষণের কাজ করে যাচ্ছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং নদীভাঙন সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যার প্রভাব বাঘদের ওপরও পড়ছে। সুন্দরবনের বাঘ প্রাকৃতিকভাবে একাকি জীবনযাপন করে এবং মানুষবিরোধী আচরণ করে থাকে, যা মাঝে মাঝে তাদের সাথে মানুষের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে।
ভুটানেও ১০৩টি বাঘ আছে। হিমালয়ের পাদদেশে ছড়িয়ে থাকা এই দেশের বনাঞ্চল বাঘদের জন্য উপযোগী আবাসস্থল হলেও এখানেও বন্যপ্রাণী শিকার ও বনভূমি সংকোচনের কারণে বিপদের আশঙ্কা রয়ে গেছে। তবে ভুটান সরকার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বেশ আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
চীনে বন্য বাঘের সংখ্যা মাত্র ৫০। এটি শুনে অনেকেই অবাক হতে পারেন, কারণ চীন একসময় অনেক বাঘের আবাস ছিল। দক্ষিণ চীনা বাঘ আজ বিলুপ্তপ্রায়, এবং দেশটি এখন টিগার ব্রীডিং সেন্টার ও জেনেটিক রিসার্চের মাধ্যমে এই প্রজাতিকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে। তবে এতদিনের বন উজাড় ও শিল্পায়নের ফলে এই প্রচেষ্টা এখন অনেকটাই প্রতীকী।
মায়ানমারে এখন মাত্র ২২টি বাঘ টিকে আছে। এই সংখ্যাটা উদ্বেগজনক। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক দ্বন্দ্ব এবং বন ধ্বংস মায়ানমারের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে ভিয়েতনামে বাঘের সংখ্যা মাত্র ৫টি, এবং লাওসেও রয়েছে মাত্র ২টি বাঘ। এই দুই দেশেই বাঘের বিলুপ্তি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক তথ্য হলো, কম্বোডিয়ায় আর কোনো বন্য বাঘ অবশিষ্ট নেই। একসময় এই দেশেও বাঘের গর্জন শুনতে পাওয়া যেত, কিন্তু চোরাশিকার এবং অনিয়ন্ত্রিত বন উজাড়ের কারণে বাঘ আজ সেখানে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত।
এই তথ্যগুলো এক ভয়ংকর বাস্তবতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—বাঘের অস্তিত্ব আজ মানুষের লোভের কারণে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। বাঘ শুধু একটি প্রাণী নয়, এটি একটি বাস্তুসংস্থানের প্রতীক। যেখানে বাঘ থাকবে, সেখানে থাকবে বন। যেখানে থাকবে বন, সেখানে থাকবে পানি, বায়ু এবং জীববৈচিত্র্য। অর্থাৎ, বাঘ টিকিয়ে রাখার মানে হলো প্রকৃতিকে টিকিয়ে রাখা।
বাঘ সংরক্ষণের চেষ্টাগুলো এখন অনেক দেশেই জোরদার হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা Global Tiger Forum, World Wide Fund for Nature (WWF) এবং United Nations Environment Programme (UNEP) বাঘ রক্ষায় নানামুখী প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত Global Tiger Summit-এ সিদ্ধান্ত হয়েছিল ২০২২ সালের মধ্যে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার। যদিও সেই লক্ষ্য পূর্ণ হয়নি, তবুও ভারত ও নেপালের মতো কিছু দেশ ব্যতিক্রমী অগ্রগতি দেখিয়েছে।
এছাড়া বাঘ সংরক্ষণের জন্য নতুন প্রজন্মকে সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি। শিশু-কিশোরদের মধ্যে প্রকৃতিপ্রেম গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো দরকার। সামাজিক মাধ্যমে বাঘ রক্ষায় ক্যাম্পেইন চালানো এবং স্থানীয় জনগণকে বন সংরক্ষণে উৎসাহিত করাও সময়ের দাবি।
সবশেষে বলা যায়, বাঘের গর্জন যেন ইতিহাসে সীমাবদ্ধ না হয়ে যায়, সে জন্য আমাদের এখনই সজাগ হতে হবে। এই রাজকীয় প্রাণীটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে না পারলে আমরা হারাবো শুধু একটি প্রজাতিই নয়, হারাবো একটি বাস্তুসংস্থান, হারাবো প্রকৃতির ভারসাম্য। আর সেই দায় বর্তায় আমাদের সবার ওপরই। আজ যারা নিরব জঙ্গলে হেঁটে বেড়াচ্ছে নিঃশব্দে, কাল তারা যদি হারিয়ে যায় চিরতরে, তবে সেই দায়ভার ইতিহাস আমাদের কাছেই রাখবে। তাই সময় থাকতেই ফিরে তাকানো উচিত—বাঘ বাঁচানো মানেই প্রকৃতি বাঁচানো।