
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের একটি দুর্গম দ্বীপে বসবাসকারী বিশ্বের বৃহত্তম পেঙ্গুইন কলোনি চরম সংকটের মুখে পড়েছে। সম্প্রতি ‘কারেন্ট বায়োলজি’ জার্নালে প্রকাশিত এক নতুন গবেষণায় জানানো হয়েছে যে, গত ১৫ বছরে এই অঞ্চলে চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি কমে গেছে।
আর্জেন্টনা থেকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পূর্বে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের একটি আগ্নেয়দ্বীপ জাভোদোভস্কি দ্বীপে এই পেঙ্গুইন কলোনিটি অবস্থিত। দ্বীপটি বিষাক্ত গ্যাস ও ছাইয়ের জন্য পরিচিত হলেও অতীতে এখানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পেঙ্গুইন কলোনি গড়ে উঠেছিল।
১৯৯৭ সালের প্রথম জরিপ অনুযায়ী এই দ্বীপে প্রায় ১২ থেকে ২০ লাখ চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইন ছিল। তবে সাম্প্রতিক ড্রোন সার্ভে ও স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন যে, ২০১০-১১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এই প্রজাতির বাসা বাঁধার স্থান বা প্রজনন ক্ষেত্র প্রায় ৬৩ শতাংশ কমে গেছে। এর ফলে পুরো দ্বীপে এখন সব মিলিয়ে পেঙ্গুইনের সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ৮ লাখ ৩৮ হাজারে।
এই ব্যাপক পতনের ফলে জাভোদোভস্কি দ্বীপটি তার ‘বিশ্বের বৃহত্তম পেঙ্গুইন কলোনি’-র খেতাবটি হারিয়ে ফেলেছে। বর্তমানে পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার কেপ অ্যাডারে অবস্থিত অ্যাডেলি পেঙ্গুইনের কলোনিটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় পেঙ্গুইন কলোনির স্থান দখল করেছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই বিপর্যয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তন। চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইন মূলত ক্রিল নামক এক ধরণের ছোট সামুদ্রিক চিংড়ি জাতীয় প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু সমুদ্রের পানি উষ্ণ হয়ে যাওয়ায় ক্রিলগুলো অ্যান্টার্কটিকার ওয়েডেল সাগরের ঠাণ্ডা পানির দিকে সরে যাচ্ছে। পর্যাপ্ত দ্বীপ বা বসতি না থাকায় পেঙ্গুইনগুলো তাদের অনুসরণ করতে পারছে না, ফলে তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে।
২০১৬ সালে দ্বীপটিতে একটি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যপাত ঘটলেও গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন যে, অগ্ন্যপাতে পেঙ্গুইনদের ওপর বড় কোনো প্রভাব পড়েনি, কারণ বিপর্যয়টি তার আগেই শুরু হয়েছিল এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে। এছাড়া অন্য প্রজাতির পেঙ্গুইনের সাথে খাদ্যের প্রতিযোগিতা নিয়েও কোনো নেতিবাচক প্রমাণ মেলেনি।
চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমলেও একই দ্বীপে বসবাসকারী ম্যাকাকারোনি পেঙ্গুইনদের সংখ্যা বরং কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে তাদের বাসা বাঁধার হার ২৮ শতাংশ বেড়েছে এবং এরপর থেকে তা স্থিতিশীল রয়েছে। এর মূল কারণ হলো ম্যাকাকারোনি পেঙ্গুইনদের খাদ্যাভ্যাস বেশ বহুমুখী; তারা শুধু ক্রিলের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন ধরনের জ্যুোপ্ল্যাংকটন ও মাছ খেতে পারে।
গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন যদি এর মূল কারণ হয়, তবে কার্বন নিঃসরণ কমানো ছাড়া এই প্রজাতিকে দ্রুত রক্ষা করার আর কোনো সহজ উপায় নেই। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, অ্যান্টার্কটিকার সামুদ্রিক প্রতিবেশ এবং এর প্রাণিকুল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কতোটা দ্রুত গভীর সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।