ঢাকামঙ্গলবার , ৩ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

বন্যায় ১০ জেলায় মানবিক বিপর্যয়, ক্ষতিগ্রস্ত ১১ লক্ষাধিক মানুষ

প্রতিবেদক
হাসান মাহমুদ
১৬ জুলাই ২০২৬, ১০:৫৭ সকাল

Link Copied!

গত ৫ জুলাই থেকে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ১০টি জেলায় শুরু হওয়া টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং আকস্মিক বন্যা জনজীবনকে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। গত ১৩ জুলাই জাতিসংঘের সমন্বিত মানবিক সহায়তা ব্যবস্থার সমন্বয়কারী প্ল্যাটফর্ম ইন্টার-ক্লাস্টার কোঅর্ডিনেশন গ্রুপ (আইসিসিজি) কর্তৃক প্রকাশিত প্রথম পরিস্থিতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই দুর্যোগে দেশের জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১১ লাখ ১৬ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। সেই সঙ্গে এই দুর্যোগ কেবল ঘরবাড়িই নষ্ট করেনি, বরং খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে চরম সংকটের মধ্যে ফেলেছে।

চলমান দুর্যোগে এখন পর্যন্ত মোট ৫১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে আইসিসিজি। ১১ লাখ ১৬ হাজার মানুষ সরাসরি বন্যার প্রভাবে তাদের ঘরবাড়ি, জীবিকা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা হারিয়েছেন। দুর্গত এলাকায় আটকে থাকা মানুষের সংখ্যা উদ্বেগজনক; প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ এখনো দুর্গম এলাকায় পানিবন্দী অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছেন, যাদের উদ্ধারের জন্য জরুরি নৌকা ও উদ্ধারকারী দল প্রয়োজন।

আশ্রয়কেন্দ্র ও বাস্তুচ্যুতি:
১২ জুলাই পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১০টি জেলায় মোট ১ হাজার ৪৭টি আনুষ্ঠানিক আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে প্রায় ৩৮ হাজার ৪২২ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তবে প্রকৃত বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা এর চেয়েও বেশি, কারণ অনেকেই আত্মীয়-স্বজন বা উঁচু কোনো স্থানে অস্থায়ী আবাস গড়ে তুলেছেন। বিশেষ করে বান্দরবান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সিলেট ও কুমিল্লার মানুষ সবচেয়ে বেশি বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়েছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো ও ঘরবাড়ি:
বন্যা ও ভূমিধস ঘরবাড়ির ওপর ব্যাপক আঘাত হেনেছে। কেবল বান্দরবান ও চট্টগ্রাম জেলাতেই প্রায় ২৯ হাজার ৭৪১টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ি ঢলে শত শত সেতু ও কালভার্ট ভেঙে পড়ায় এবং অনেক রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এর ফলে উদ্ধারকারী দল ও ত্রাণবাহী ট্রাকগুলোর জন্য দুর্গত এলাকায় পৌঁছানো এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বাস্থ্য, পানি ও স্যানিটেশন সংকট:
দুর্যোগের কারণে পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অন্তত ৩ হাজার ৫৮৩টি পানির উৎস বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত বা দূষিত হয়েছে। পাশাপাশি ১২ হাজার ৩৬০টি ল্যাট্রিন ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ায় ওই এলাকায় পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য বিভাগ আক্রান্ত জেলাগুলোতে মেডিকেল টিম মোতায়েন করলেও, দুর্গম এলাকায় চিকিৎসা সেবা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

সরকারি ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা:
সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় তৎপর রয়েছে। ৭ থেকে ১২ জুলাইয়ের মধ্যে সরকার এক কোটি ৭৫ লাখ টাকাএবং ৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ করেছে। এর পাশাপাশি সেনাবাহিনী, কোস্ট গার্ড, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নিচ্ছে। এছাড়া, স্টার্ট ফান্ড বাংলাদেশ নগদ অর্থ, খাবার ও সুরক্ষা সামগ্রী হিসেবে প্রায় ১৩ কোটি টাকা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে।

বিশেষ প্রয়োজন ও সুরক্ষা উদ্বেগ:
বন্যায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে অন্তত ১২ হাজার ৯০০ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছেন। এছাড়া আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নারী, শিশু ও কন্যাশিশুদের সুরক্ষা ও গোপনীয়তা বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা (জিবিভি) রোধে বিভিন্ন সংস্থা বিশেষ নজর রাখছে এবং আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছে।

শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর প্রভাব:
বন্যায় শিক্ষা খাতও বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। প্রায় ১ হাজার ২৭৬টি স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, যার ফলে প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪০০ শিক্ষার্থী পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনেক স্কুলকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় শুরুর ক্ষেত্রে বিলম্ব ঘটাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস ও সতর্কতা:
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি) ও বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, আগামী সোমবার পর্যন্ত সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। এই পূর্বাভাস অত্যন্ত আশঙ্কাজনক, কারণ এতে বিদ্যমান বন্যা ও ভূমিধস পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

সমন্বিত কর্মপন্থা:
ইন্টার-ক্লাস্টার কোঅর্ডিনেশন গ্রুপ জোর দিয়ে বলছে যে, এই দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্তদের আবাসন মেরামত, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বর্তমান দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে দেশি-বিদেশি সকল সংস্থার সমন্বিত ও স্বচ্ছ ত্রাণ কার্যক্রমই এখন একমাত্র ভরসা।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

সাহারা মরুভূমিতে মিলল ৪১০ কোটি বছরের পুরোনো মঙ্গল গ্রহের উল্কাপিণ্ড

৩৫ উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা

ভালো ফলন ও দামে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাটচাষিদের মুখে হাসি

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল তরুণ ইনফ্লুয়েন্সার জেজুনের

হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক-নার্স সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

সময়মতো ন্যায্যমূল্যে কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর নির্দেশ কৃষিমন্ত্রীর

৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকায় পদ্মা ব্যারাজ, বদলে যাবে ১৯ জেলার চিত্র?

বাইন্যান্সের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে ৬৩০ কোটি ডলার চুরি, নেপথ্যে কারা?

শুঁটকিতেও মিলল বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক: শীর্ষে লইট্টা ও চিংড়ি

যুদ্ধে বিপর্যস্ত কৃষ্ণসাগর: সাড়ে ৪ বছরে ১ লাখ ২০ হাজার ডলফিনের মৃত্যু

সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জীবন বাঁচাতে তরুণদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও সিপিআর প্রশিক্ষণ

হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় দুই শিশুর মৃত্যু