ঢাকাবুধবার , ৪ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

প্রকৃতির কোলে এক নিভৃত আশ্রয়: একামরা কানন বোটানিক্যাল গার্ডেন

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
৩১ জুলাই ২০২৫, ২:২৩ বিকাল

Link Copied!

ভুবনেশ্বরের ব্যস্ত নগরজীবনের কোলাহল ছাপিয়ে, এক সুবিশাল সবুজ আশ্রয় যেন হাতছানি দেয় প্রকৃতির ভালোবাসায় মোড়া এক ভিন্ন জগতে। যখনই কর্মব্যস্ততা ক্লান্ত করে তোলে মনকে, শহরের ইট-কাঠের বেড়া পেরিয়ে প্রশান্তির এক মরুদ্যান খুঁজতে মন আনচান করে, তখনই স্মরণে আসে একামরা কানন বোটানিক্যাল গার্ডেনের কথা। সকালের নরম রোদ যখন ঘাসের ওপর মুক্তোর মতো শিশিরবিন্দু ছড়ায়, অথবা বিকেলে যখন গাছের পাতায় পাতায় গোধূলির আভা লেগে থাকে, তখনই একামরা কানন তার মায়াবী রূপ মেলে ধরে। এই বিশাল উদ্যানটি শুধু গাছপালা আর ফুলের সমাহার নয়, এটি যেন ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী, যেখানে প্রকৃতির নিবিড় যত্নে বেড়ে উঠেছে প্রাণের স্পন্দন।

১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বোটানিক্যাল গার্ডেনটি ওড়িশার পরিবেশ সচেতনতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রায় ৫০০ একর বিস্তৃত এই উদ্যানটি ওড়িশা সরকারের আঞ্চলিক উদ্ভিদ সম্পদ কেন্দ্র (Regional Plant Resource Centre – RPRC) দ্বারা নিবিড়ভাবে পরিচালিত হয়। এখানে পা রাখা মাত্রই আপনি অনুভব করবেন এক আশ্চর্য নীরবতা, যা শহরের চিরচেনা গাড়ির হর্ন বা মানুষের চিৎকার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানকার প্রতিটি ধূলিকণা, প্রতিটি পাতার মর্মর ধ্বনি যেন প্রকৃতির এক নিজস্ব সুরের মূর্ছনা তৈরি করে, যা আপনাকে মুহূর্তেই মুগ্ধ করে তুলবে। এখানে রয়েছে দিগন্তবিস্তৃত সবুজ লন, কোথাও উঁচু-নিচু টিলার মতো ভূখণ্ড, আবার কোথাও ঘন বন্য উদ্ভিদের সমাহার, যা দূরবর্তী চন্দ্রকা বনের সঙ্গে যেন এক প্রাকৃতিক সেতু রচনা করেছে। হেঁটে যেতে যেতে আপনি অনুভব করবেন মাটির নরম স্পর্শ, বিশুদ্ধ বাতাসের স্নিগ্ধতা আর সূর্যের নরম উত্তাপ।

একামরা কাননের হৃদপিণ্ড যেন এর বিশাল, ৪০ একরের কৃত্রিম হ্রদ। এই স্বচ্ছ জলের উপর ভেসে বেড়ানো প্যাডেল বোটগুলো যখন হ্রদের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে নীরবে চলে, তখন মনে হয় যেন এক স্বপ্নের জগতে প্রবেশ করেছেন। জলের মৃদু ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর পাখির কিচিরমিচির মিশে এক অসাধারণ পরিবেশ তৈরি করে। বিশেষ করে শীতকালে, যখন সুদূর সাইবেরিয়া বা অন্যান্য ঠান্ডা অঞ্চল থেকে পরিযায়ী পাখিরা এই হ্রদের উষ্ণ আশ্রয়ে আসে, তখন পুরো এলাকা এক নতুন জীবন ফিরে পায়। পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত হয় আকাশ, তাদের বিচিত্র ওড়াওড়ি জলের উপর এক অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্য সৃষ্টি করে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে, অথবা প্রিয়জনের হাত ধরে বোটিং করতে করতে আপনি শহরের সকল চিন্তা একপাশে সরিয়ে রেখে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হওয়ার এক দুর্লভ সুযোগ পাবেন।

এই উদ্যানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো এর ক্যাকটাস গার্ডেন, যা একামরা কাননকে “ক্যাকটাস গার্ডেন” নামেও পরিচিতি দিয়েছে। একটি বিশাল কাঁচের ঘরের ভেতর প্রায় ১,০০০ এরও বেশি প্রজাতির ক্যাকটাস ও সাকুলেন্ট যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করা হয়েছে। বিভিন্ন আকার, আকৃতি ও রঙের এই কাঁটাযুক্ত উদ্ভিদগুলো যেন প্রকৃতির এক বিচিত্র শিল্পকর্ম। এদের অদ্ভুত সৌন্দর্য আপনাকে অবাক করে দেবে। প্রতিটি ক্যাকটাসের সামনে দাঁড়িয়ে আপনি অনুভব করবেন, প্রতিকূল পরিবেশেও প্রকৃতি কিভাবে জীবনকে বাঁচিয়ে রাখে, তার এক নীরব বার্তা।

শুধু ক্যাকটাসই নয়, একামরা কানন যেন বিভিন্ন থিমের বাগানের এক বিশাল প্রদর্শনী। ঔষধি উদ্ভিদের বাগানটি আপনাকে প্রাচীন আয়ুর্বেদিক জ্ঞান ও ভেষজ বিদ্যার এক ঝলক দেখাবে। এখানে পরিচিত ও অপরিচিত নানা ধরনের ঔষধি গাছ দেখতে পাবেন, যা আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখতে কিভাবে অবদান রাখে তার এক জীবন্ত পাঠশালা এটি। অর্কিডিয়ামের ভেতরে প্রবেশ করলেই আপনি মুগ্ধ হবেন অর্কিডের বিচিত্র রঙ আর সূক্ষ্ম বিন্যাসে। প্রতিটি অর্কিড যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক জীবন্ত ছবি। আর প্রজাপতি পার্ক? সেখানে প্রজাপতিদের ডানার ছন্দময় ওড়াওড়ি, তাদের ঝলমলে রঙ আর ফুলের পরাগরেণু নিয়ে তাদের ব্যস্ততা আপনাকে এক জাদুকরী জগতে নিয়ে যাবে। শিশুদের জন্য তো বটেই, বড়দের জন্যও এটি এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। বন্য ফল এবং বাঁশের বিভাগগুলো প্রকৃতির ভিন্ন দিক উন্মোচন করে, যেখানে বাঁশের দীর্ঘ বৃক্ষরাজি এক ভিন্ন রকম পরিবেশ সৃষ্টি করে।

গোলাপ বাগানটি তার সৌরভ আর সৌন্দর্যে মনকে জুড়িয়ে দেয়। লাল, গোলাপি, হলুদ, সাদা—নানা রঙের গোলাপের সমাহারে যেন এক স্বপ্নিল জগৎ তৈরি হয়েছে। প্রতিটি গোলাপ ফুল যেন প্রেমের এক নীরব বার্তা বহন করে। গোলাপ বাগানের পাশেই রয়েছে বনসাই বাগান, যেখানে ক্ষুদ্রাকৃতির গাছগুলো শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় এক নতুন রূপ পেয়েছে। শতবর্ষী গাছের ক্ষুদ্র সংস্করণগুলো দেখে আপনি বনসাই শিল্পের প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধা অনুভব করবেন। আর বিশাল ফলের বাগানটি আপনাকে দেবে প্রকৃতির প্রাচুর্যের এক ধারণা। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু—নানা ধরনের ফলের গাছ এখানে বেড়ে উঠেছে, যা দেখলে মনে হবে যেন গ্রাম বাংলার সবুজ শ্যামলিমায় ফিরে গেছেন।

একামরা কানন শুধু একটি বোটানিক্যাল গার্ডেন নয়, এটি এক বৃহৎ বাস্তুতন্ত্র, যেখানে উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষ এক সুসংহত সম্পর্কে আবদ্ধ। এখানে রয়েছে একাধিক হাঁটার পথ, যেখানে আপনি নির্দ্বিধায় মাইলের পর মাইল হেঁটে প্রকৃতির অকৃত্রিম সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। পরিবার বা বন্ধুদের সাথে পিকনিক করার জন্যও রয়েছে নির্ধারিত স্থান, যেখানে প্রকৃতির কোলে বসে আপনারা নির্মল আনন্দ ভাগ করে নিতে পারবেন। সন্ধ্যায় যখন সূর্যাস্তের পর আলো-আঁধারির খেলা চলে, তখন মিউজিক্যাল ফাউন্টেনটি তার জল ও আলোর প্রদর্শনী দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করে তোলে। জলের তালে তালে আলোর নৃত্যে পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও মনোমুগ্ধকর। শিশুদের জন্য রয়েছে খেলার সুব্যবস্থা, যেখানে তারা মুক্ত মনে দৌড়াদৌড়ি করে আনন্দ উপভোগ করতে পারে। এই উদ্যানটি পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে, যেখানে এসে মানুষ পরিবেশের প্রতি আরও যত্নশীল হতে শেখে।

ভুবনেশ্বরের এই প্রকৃতির আশ্রয়স্থল সকাল ৮:০০ টা থেকে সন্ধ্যা ৬:০০ টা পর্যন্ত (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিকেল ৫:০০ টা পর্যন্ত) দর্শকদের জন্য খোলা থাকে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ২৫ টাকা এবং ৩ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ১০ টাকা প্রবেশমূল্য নির্ধারিত আছে, যা এই বিশাল প্রকৃতির ভান্ডার উপভোগ করার জন্য সত্যিই সামান্য। উদ্যানের পাশেই রয়েছে একামরা হাট, যেখানে স্থানীয় হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের পসরা বসে। বাগান পরিদর্শনের পর আপনি চাইলে এই হাটে ঘুরে এসে স্থানীয় সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সাথে পরিচিত হতে পারেন।

একামরা কানন বোটানিক্যাল গার্ডেন শুধুমাত্র একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি একটি অভিজ্ঞতা। প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে নিজেদের পুনরুজ্জীবিত করার, নতুন কিছু শেখার এবং শান্তিপূর্ণ সময় কাটানোর এক অনন্য সুযোগ এটি। তাই, যখনই আপনার মন প্রকৃতির সান্নিধ্য চাইবে, একামরা কানন আপনাকে তার সবুজ কোলে এক নিভৃত আশ্রয় দিতে প্রস্তুত।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

নওগাঁয় ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে ব্যাংক কর্মচারীর মৃত্যু

সপ্তাহজুড়ে কেমন থাকবে দেশের আবহাওয়া? জানাল অধিদপ্তর

স্তনবৃন্তে স্পর্শ করলেই কেন হঠাৎ মন খারাপ, কী এই ‘স্যাড নিপল সিনড্রোম’?

upay Rewards Three Distributor Partners with Umrah Packages under ‘Shopner Umrah 2026’ Campaign

উপায়ের ‘স্বপ্নের ওমরাহ’ ক্যাম্পেইনে পুরস্কার পেলেন ৩ ডিস্ট্রিবিউশন পার্টনার

সাতক্ষীরায় ৭৫ শতাংশ জলবায়ু বাস্তুচ্যুত পরিবার তীব্র খাদ্য সংকটে

মিরপুর বেড়িবাঁধে বাস-অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত ৪

হাসপাতাল নেই ৬০ গ্রামে, অসুস্থ হলে আট ঘণ্টার নদীপথ পাড়ি

চাঁদপুরে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহারে ৬ যানবাহনকে জরিমানা

ঢাকায় শুষ্ক আবহাওয়া, কমতে পারে দিনের তাপমাত্রা

বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু রক্ষায় ১২ সংস্থার সঙ্গে ইউএনডিপির চুক্তি

সড়ক দুর্ঘটনার আচরণগত ঝুঁকি নিরসনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাথে মতবিনিময় সভা