ঢাকাশনিবার , ২৪ অক্টোবর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. জনস্বাস্থ্য

পাঁচ মাস পরও থামছে না হামের মৃত্যু, প্রশ্ন টিকা কার্যক্রমের সফলতা নিয়ে

প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৭ সকাল

Link Copied!

দেশে মহামারি আকারে হাম ছড়িয়ে পড়ার পাঁচ মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। প্রতিদিনই বাড়ছে হামের উপসর্গে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। এতে শিশুদের অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও বাড়ছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনা, কুমিল্লা ও মৌলভীবাজারে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হাম ও এর উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৯৪ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মারা গেছে ১০০ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৮৯৪ জনের।

এ সময়ের মধ্যে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যাও ছাড়িয়েছে এক লাখ ৬৪ হাজার। আক্রান্তদের মধ্যে শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদেরও হাম হওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

টিকার পরও কেন কমছে না সংক্রমণ

দেশে হাম ছড়িয়ে পড়ার পর গত এপ্রিলে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছিল, কয়েক মাসের মধ্যে ব্যাপক টিকাদানের ফলে দেশে শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ বলয় বা ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হবে এবং হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে।

তবে বাস্তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন মনে করেন, হার্ড ইমিউনিটি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিশুকে কার্যকরভাবে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি অব্যবস্থাপনার কারণেও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করেন তিনি।

হাসপাতালে বাড়ছে আক্রান্ত শিশু

ঢাকার কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা মোজাম্মেল হকের সাত মাস বয়সি মেয়ে কয়েকদিন ধরে তীব্র জ্বরে ভুগছিল। শুরুতে সাধারণ জ্বর মনে হলেও পরে শরীরে র‍্যাশ দেখা দেয়। ডেঙ্গু হয়েছে সন্দেহ করে তাকে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা জানান, শিশুটি হামে আক্রান্ত।

হাম ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে ঢাকার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে আসছেন অভিভাবকেরা। রোগীর চাপ বাড়ায় একপর্যায়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শয্যাসংখ্যাও দ্বিগুণের বেশি বাড়ায়।

হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আতিকুল ইসলাম জানান, টিকা কার্যক্রম শুরুর পর জুন-জুলাইয়ে রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমেছিল। তবে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আবার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে।

টিকা দেওয়ার পরও প্রশ্ন কাভারেজ নিয়ে

সারাদেশে হাম ছড়িয়ে পড়ার পর প্রথমে জরুরি ভিত্তিতে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ৩০টি উপজেলায় টিকা কার্যক্রম শুরু করে সরকার। এরপর ২০ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশুদের গণহারে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয়।

কর্মসূচির শুরুতে সরকার প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, এপ্রিল ও মে মাসের ক্যাম্পেইনে প্রায় এক কোটি ৯৬ লাখ ৬১ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

তবে এই হিসাব নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে। তাদের যুক্তি, টিকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ব্যবহৃত জনসংখ্যার তথ্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির পার্থক্য থাকতে পারে।

এরই মধ্যে গত জুনে একই বয়সি শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্মসূচিতে প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ শিশুর হিসাব পাওয়া যায়। ফলে হাম টিকা কর্মসূচিতে শতভাগের বেশি কাভারেজের দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা প্রয়োজন ছিল। তবে পরে তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের তথ্য সংগ্রহ করে মাইক্রো প্ল্যানিং করার প্রয়োজন ছিল। এতে বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হতো বলে মনে করেন তিনি।

চিকিৎসায় দেরি হলে বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি

চিকিৎসকেরা বলছেন, যেসব শিশুকে যথাসময়ে চিকিৎসার আওতায় আনা যাচ্ছে না, তাদের মধ্যে জটিলতা বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে থেকে আসা অনেক শিশুর অবস্থা গুরুতর হয়ে উঠছে।

ডা. মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগীদের অনেকের মধ্যেই বিভিন্ন জটিলতা দেখা যাচ্ছে। এসব জটিলতার কারণে কিছু রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে মৃত্যু হচ্ছে।

জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি বিশেষজ্ঞদের

হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে শুরু থেকেই আরও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে সমন্বিতভাবে টিকা, চিকিৎসা ও জনসচেতনতা কার্যক্রম চালানো হলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হতো।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, শুরু থেকেই হামকে মহামারি বা স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন ছিল। বিভিন্ন দিক থেকে একযোগে কার্যক্রম চালানো গেলে হাম এত দীর্ঘায়িত হতো না বলেও মনে করেন তিনি।

বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ

এদিকে টিকাদান কর্মসূচির পরও হার্ড ইমিউনিটি তৈরি না হওয়ায় টিকা কার্যক্রমের সফলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও স্বীকার করেছেন, দীর্ঘদিন নিয়মিত হাম টিকা ক্যাম্পেইন না হওয়ায় দেশে টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা বেড়েছিল।

তিনি জানান, ক্যাম্পেইনের পর নতুন করে টিকাদানের উপযুক্ত হওয়া শিশুদের একটি অংশ এবং সচেতনতার অভাবে সময়মতো টিকা না পাওয়া শিশুরা এখনও টিকাবঞ্চিত রয়েছে। ফলে তাদের মধ্যে হাম ছড়িয়ে পড়ছে।

এ অবস্থায় বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে ছয় মাসের কম ও পাঁচ বছরের বেশি বয়সি শিশুদের মধ্যেও হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ায় তাদের টিকার আওতায় আনার বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে।

হাম আক্রান্ত শিশুদের জেলা ও উপজেলা পর্যায়েই যাতে মানসম্মত চিকিৎসা দেওয়া যায়, সে বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

দেশব্যাপী হাতি জরিপ পরিচালনা করবে অরণ্যক ফাউন্ডেশন

বিশ্বের সেরা নতুন ভবনের স্বীকৃতি পেল রংপুরের ‘গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি’

আম-লিচু বাগানে প্রথমবারের মতো মিলল নতুন প্রজাতির ঝিঁঝিঁ পোকা

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণে দেশের রোল মডেল হতে পারে বরিশাল

পাট খাতে চীনের প্রযুক্তি ও গবেষণা সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ

Xiaomi Launches Xiaomi TV S Pro Mini LED and Xiaomi TV X Mini LED Series in Bangladesh

বাংলাদেশে শাওমি টিভি এস প্রো মিনি এলইডি ও শাওমি টিভি এক্স মিনি এলইডি নিয়ে এলো শাওমি

স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসার শনাক্তে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করছে সরকার

তৃণমূল পর্যায়ে স্তন ক্যান্সার শনাক্তে স্ক্রিনিং চালুর উদ্যোগ সরকারের

হামের উপসর্গে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু, নতুন রোগী ১,২৫৪

সিলেটে হামের উপসর্গে আরও ২ শিশুর মৃত্যু, মোট ১৯৫

সোনাইমুড়ীতে ট্রলির চাপায় মাদরাসাছাত্রের মৃত্যু