
আজ পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য- ‘মানসম্মত হেলমেট ও নিরাপদ গতি, কমবে জীবন ও সম্পদের ক্ষতি।’ তবে দিবসটির আলোচনায় উঠে এসেছে আরেকটি নতুন উদ্বেগ- নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে চলা ব্যাটারিচালিত রিকশা, যা দেশের সড়ক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরে গত এক বছরে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়েছে। সাধারণ রিকশায় ব্যাটারি সংযোজন করে তৈরি এসব বাহন গতি বাড়ালেও এর ব্রেকিং সিস্টেম দুর্বল, ফলে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা।
দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলার নতুন চেহারা
ট্রাফিক পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাটারি রিকশার চালকরা অনেকেই অদক্ষ ও আইন সম্পর্কে অজ্ঞ। তারা প্রায়ই ভুল লেনে চলে, হঠাৎ গতি পরিবর্তন করে বা উল্টো পথে আসে, যা দ্রুতগতির যানবাহনের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বলছে, গত সেপ্টেম্বরে শুধু ব্যাটারিচালিত রিকশা দুর্ঘটনায় আটজন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে অটোরিকশা দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৩৯ জন, আর ইজিবাইক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে আরো আটজনের। আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ।
আইনি নিয়ন্ত্রণের বাইরে লাখো যান
দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিবন্ধনের কোনো আইনি কাঠামো নেই। ফলে সরকারের কোনো সংস্থার কাছেই এসব যানবাহনের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদে তৎকালীন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানান, দেশে ৪০ লাখেরও বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চলাচল করছে। খাতসংশ্লিষ্টদের ধারণা, গত দেড় বছরে এ সংখ্যা আরও কয়েক লাখে পৌঁছেছে।
“ঢাকাকে মফস্বলে পরিণত করছে ব্যাটারি রিকশা”
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, “বিশৃঙ্খলা, যানজট ও নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি এসব ব্যাটারিচালিত রিকশা রাজধানী ঢাকাকে মফস্বল শহরে পরিণত করেছে। প্রশাসনের নাকের ডগায়ই এগুলোর সংখ্যা বাড়ছে, অথচ নিয়ন্ত্রণে নেই কোনো কার্যকর উদ্যোগ।”
তিনি আরও বলেন, “যে সংস্থাগুলোকে সরকার রেগুলেটর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে, তারা কার্যকর ভূমিকা না রেখে দর্শকের মতো আচরণ করেছে। এখন এ বাহন একটি ‘বিরাট ব্যাধিতে’ পরিণত হয়েছে। একে নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং উৎপাদক পর্যায় থেকে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।”
সরকারের উদ্যোগ: বিকল্প নিরাপদ বাহনের ভাবনা
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানান, সরকার ব্যাটারি রিকশার পরিবর্তে নিরাপদ বিকল্প যান প্রবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে।
“বুয়েটের সহায়তায় সেফ মোটরাইজড রিকশা ডিজাইন করা হয়েছে। উৎপাদক পর্যায়ে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। ঢাকায় এসব আধুনিক ও নিরাপদ রিকশা নিবন্ধন দেওয়ার চিন্তা রয়েছে। পাশাপাশি শহরের অভ্যন্তরীণ সড়কে ব্যাটারি রিকশা চলাচল সীমিত রাখার দিকেও চিন্তাভাবনা চলছে।”
সমাধান দরকার এখনই
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্বল ব্রেকিং সিস্টেম, নিম্নমানের নির্মাণ, এবং বেপরোয়া চালনার সংস্কৃতি-এই তিন কারণেই ব্যাটারিচালিত রিকশা দুর্ঘটনা বাড়ছে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নীতি, নিবন্ধন ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষিত চালক তৈরির উদ্যোগ।
আজ নিরাপদ সড়ক দিবসে তাই প্রশ্ন উঠছে-কবে নাগাদ দেশের সড়কগুলো সত্যিকার অর্থে হবে নিরাপদ?
সূত্র: বণিক বার্তা