
বাংলাদেশে তামাক একটি নীরব ঘাতক। প্রতিবছর দেড়লক্ষাধিক মানুষ তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে। অথচ তামাক নিয়ন্ত্রণে দেশে একটি কার্যকর আইন থাকা সত্ত্বেও তা যথাযথভাবে প্রয়োগ না হওয়ায় জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে।
২০০৫ সালে বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন পাস হয়, যা ২০১৩ সালে সংশোধিত হয়। বর্তমানে আইনটি আবার সংশোধনের প্রস্তাবনাও আলোচনাধীন। এই আইনের মাধ্যমে ধূমপান ও অন্যান্য তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে পাবলিক প্লেস, পাবলিক পরিবহন এবং শিক্ষা ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে। তামাকপণ্যের বিজ্ঞাপন, প্রচার ও পৃষ্ঠপোষকতা নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
তামাক নিয়ন্ত্রণে কিছু অর্জন
বাংলাদেশ তামাক নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জন করেছে। যেমন:
১. তামাকপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি ও অন্যান্য কার্যক্রমের ফলে মানুষের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার কিছুটা হলেও কমেছে।
২. পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহনে ধূমপান কমেছে। আগে ব্যাপকভাবে ধূমপান দেখা গেলেও এখন পরিবহনের ভেতরে অনেকেই আর ধূমপান করেন না।
৩. সচেতনতা বেড়েছে—ধূমপান যে ক্ষতিকর, এটা এখন অনেকেই জানে।
তবুও সমস্যার শেষ নেই
এসব অগ্রগতির মাঝেও আইন প্রয়োগের দুর্বলতা জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ঢাকার বিভিন্ন বাস টার্মিনাল, নদী বন্দরের আশেপাশে এবং রেলস্টেশন এলাকায় এখনো সিগারেট বিক্রি ও পাবলিক পরিবহন ও পাবলিক প্লেসের মধ্যে ধূমপান করতে দেখা যায়। সেখানে শত শত সাধারণ মানুষ, শিশু ও নারীরা প্রতিনিয়ত পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছেন। আইন অনুযায়ী এসব কর্মকাণ্ড শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্লিপ্ততার কারণে অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে।
আইনের প্রয়োগে সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার বিধান থাকলেও তা শুধুমাত্র জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ। দেশের ৬৪টি জেলায় জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে অল্পসংখ্যক মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়, যা ব্যাপকতা ও কার্যকারিতার দিক থেকে অপ্রতুল।
অথচ সরকারের অন্যান্য সংস্থা, যেমন:
১. জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর
২. বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)
৩. বাংলাদেশ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)
৪. পুলিশ অধিদপ্তর
৫. সিটি কর্পোরেশনসমূহ
এসব সংস্থাও তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় আইন প্রয়োগের ক্ষমতা রাখে, কিন্তু বাস্তবে তারা প্রায় নিষ্ক্রিয়।
পরিবহন মালিক ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা
যেসব পরিবহন, রেস্টুরেন্ট, টার্মিনাল বা অন্যান্য পাবলিক প্লেসে তামাক ব্যবহার হয় বা সিগারেট বিক্রি হয়, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে সংশ্লিষ্ট মালিক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, তারা নিজেরাই কখনো ব্যবহারকারী, আবার কখনো নিরবতা পালনের মাধ্যমে অনৈতিকভাবে ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করছেন।
করণীয়
১. আইন সংশোধন ও শক্তিশালীকরণ: প্রস্তাবিত আইন সংশোধন দ্রুত সম্পন্ন করে নতুন আইন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
২. সব সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম: মোবাইল কোর্ট পরিচালনার দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের বাইরেও অন্যান্য সংস্থাকে সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করতে হবে।
৩. জনসচেতনতা বৃদ্ধি: গণমাধ্যম, সামাজিক প্রচারণা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তামাকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
৪. পাবলিক প্লেস ও পরিবহনে কঠোর নজরদারি: সংশ্লিষ্ট মালিক ও ব্যবস্থাপককে আইন মানতে বাধ্য করতে হবে এবং আইনভঙ্গকারীদের জরিমানা করতে হবে।
বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণে আইন রয়েছে, কিন্তু তার সঠিক প্রয়োগ এখনো অনিশ্চিত। আইনের বাস্তবায়ন ছাড়া শুধুমাত্র সচেতনতায় তামাকের ভয়াল থাবা থেকে জাতিকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই এখনই সময়—আইনের শক্ত প্রয়োগ নিশ্চিত করা, যাতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি সুস্থ, তামাকমুক্ত বাংলাদেশ পায়।
লেখক- আমিনুল ইসলাম বকুল, গবেষক ও উন্নয়ন কর্মী।