
বৈশ্বিক অস্থিরতা, আমদানি নির্ভরতা ও অভ্যন্তরীণ গ্যাস মজুদের সীমাবদ্ধতায় চরম জ্বালানি ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থায় এখনই কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ না নিলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, শিল্প ও কৃষি খাত ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
বর্তমানে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত ও জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ আমদানি ব্যাহত হলে পুরো দেশে কয়েক দিনের মধ্যেই জ্বালানি সরবরাহে ছন্দপতন ঘটতে পারে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর এলএনজি সরবরাহে এসব বৈশ্বিক সংকট সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের অবস্থা ভয়াবহ
দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানা থেকে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস প্রায় শেষ পর্যায়ে। হাইড্রোকার্বন ইউনিটের প্রতিবেদন বলছে, ৫ হাজার ৩২১ বিসিএফ প্রমাণিত মজুদের মধ্যে ইতোমধ্যে উত্তোলন হয়েছে ৪ হাজার ৫৩১ বিসিএফ। অবশিষ্ট গ্যাস মাত্র ৭৮৯ বিসিএফ—এবং তা আরও দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।
নতুন কূপে গ্যাস নেই, প্রকল্পে ধীরগতি
দেশজুড়ে প্রায় ১০০টি নতুন অনুসন্ধান কূপ খননের পরিকল্পনা থাকলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। গভীর সমুদ্রেও অনুসন্ধান চলছে, কিন্তু দরপত্র আহ্বানের পর প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একেকটি অনুসন্ধান প্রকল্পে ৩ থেকে ৭ বছর সময় লাগে।
ব্যাংকিং সংকট ও ডলার ঘাটতির প্রভাব
ব্যাংকিং খাতে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, এলসি জটিলতা এবং বাণিজ্যিক নিষ্ক্রিয়তা আমদানি বিলম্বিত করছে। বিশেষ করে বিশ্ববাজারে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও দেশের রিজার্ভ ঘাটতির কারণে জ্বালানি আমদানি কঠিন হয়ে পড়েছে।
সরকারের উদ্যোগ ও সীমাবদ্ধতা
সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। নেপাল থেকে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি, সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারে গুরুত্ব আরোপ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ২০% নবায়নযোগ্য শক্তির লক্ষ্য নির্ধারণ—এসব প্রশংসনীয় হলেও অপর্যাপ্ত বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ: এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, “আগাম পদক্ষেপ না নিলে বড় ধরনের বিপর্যয় অনিবার্য। এখনই বিকল্প উৎসের সন্ধান ও অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে হবে।”
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক রাইসুল সৌরভ জানান, “আমাদের জ্বালানি উৎপাদন গ্যাস ও কয়লার উপর নির্ভরশীল। এই মজুদ শিল্প ও বিদ্যুতের জন্য যথেষ্ট নয়। তাই আমদানিনির্ভরতা বাড়ছেই।”
সিপিডির গবেষণা পরিচালক গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “পূর্ববর্তী সরকারের সময় লুটপাট ও অপচয় হয়েছে, আর বর্তমানে নীতিনির্ধারণে দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। ৩-ডি সিসমিক সার্ভে না করায় ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে।”
সমাধানের পথ কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার, কৌশলগত গ্যাস ও জ্বালানি মজুদ গড়ে তোলা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। পাশাপাশি, একটি জাতীয় জ্বালানি ন্যায়বিচার নীতি গ্রহণের ওপরও জোর দিয়েছেন তারা।
জ্বালানি নিরাপত্তার বর্তমান সংকট শুধু একটি খাত নয়, বরং গোটা অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। তাই সময় নষ্ট না করে দ্রুত, সুপরিকল্পিত ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণই হতে পারে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়ানোর একমাত্র পথ।