
বাংলাদেশের জলবায়ু গত এক দশকে দৃশ্যমানভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। এক সময়ের পূর্বাভাসযোগ্য ঋতুচক্র এখন হয়ে উঠছে অনিয়মিত ও অপ্রত্যাশিত। কখনো তীব্র গরম, কখনো অকালবৃষ্টি, আবার হঠাৎ করে ঘূর্ণিঝড় বা বন্যা—সব মিলিয়ে দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাবের মুখে পড়েছে।
বৃষ্টি কমলেও জলাবদ্ধতা বেড়েছে
বাংলাদেশে এবার বর্ষা মৌসুম শুরু হয়েছে তুলনামূলকভাবে দেরিতে, তবে অল্প সময়েই অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে শহরাঞ্চলে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরে নালা-নর্দমার দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে অল্প বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র ভোগান্তি।
বর্ধিত তাপমাত্রায় কৃষিতে প্রভাব
চলতি বছর (২০২৫) মে-জুন মাসজুড়ে দেশের অনেক অঞ্চলে ৩৮ থেকে ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে, যা স্বাভাবিক গড় তাপমাত্রার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এতে কৃষিজ উৎপাদন, বিশেষত আমন ধান, সবজি ও ফলের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
ঘূর্ণিঝড় ও লঘুচাপের আধিক্য
এ বছর বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় ও গভীর নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছে বেশ কয়েকবার, যার প্রভাব পড়েছে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে। মে মাসে ‘রিমাল’ নামের একটি ঘূর্ণিঝড়ে সাতক্ষীরা ও খুলনার কিছু এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি হয়। এছাড়া জুনে একাধিক লঘুচাপ ও নিম্নচাপ সৃষ্টি হওয়ায় সমুদ্রবন্দরগুলোতে নিয়মিতভাবে ৩ নম্বর সতর্কতা সংকেত জারি করা হয়েছে।
বন্যা ও নদীভাঙন: নতুন হুমকি
উত্তরাঞ্চলে—বিশেষ করে সিলেট, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে—বন্যার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে মৌসুমি ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলের কারণে। নদীভাঙনও বাড়ছে। এই অঞ্চলের বহু পরিবার প্রতিবছরই জমি ও ঘরবাড়ি হারাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনে স্বাস্থ্যঝুঁকি
জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া, হিটস্ট্রোকসহ নানা ধরনের রোগবালাইও বেড়েছে। চলতি মৌসুমেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, রংপুরসহ বিভিন্ন জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
পরিবেশবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ আবহাওয়া পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অর্থনীতিতে। তারা আরও বলছেন, উন্নত জলের নিষ্কাশন ব্যবস্থা, আধুনিক কৃষিপদ্ধতি, পরিবেশবান্ধব নগরায়ন এবং সচেতনতা ছাড়া জলবায়ুর এই নেতিবাচক প্রভাব রোধ করা কঠিন হবে।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সামনের সারির ভুক্তভোগী দেশগুলোর একটি। এখানকার জনগণের জীবন ও জীবিকা এখন আবহাওয়ার খামখেয়ালি আচরণের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। বর্তমান বাস্তবতায় টেকসই পরিবেশনীতি, দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোর জন্য আগাম প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জরুরি হয়ে পড়েছে।