জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকা বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল আজ একদিকে যেমন দুর্যোগের ভার বহন করছে, তেমনি অন্যদিকে বহন করছে সম্ভাবনার শক্ত ভিত। এই দ্বৈত বাস্তবতাকে সামনে এনে উপকূলকে কেবল সংকটের অঞ্চল হিসেবে নয়, বরং কৃষি, সামুদ্রিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান।
রোববার (১৪ ডিসেম্বর) রাজধানীর বিজয় সরণিতে বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘর মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত দুদিনব্যাপী জাতীয় উপকূল সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, কৃষক, নারী, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিনিধি, উপকূলে কর্মরত সংগঠন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সম্মিলিত অংশগ্রহণে এই সম্মেলন দুর্যোগ প্রস্তুতি, সাড়াপ্রদান ও জলবায়ু অভিযোজনে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের কাজ ও সক্ষমতার একটি নতুন মেলবন্ধন সৃষ্টি করেছে।
সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে অংশগ্রহণকারীদের আলোচনা ও মতামতের ভিত্তিতে একটি ‘উপকূল ঘোষণাপত্র’ উপস্থাপন করা হয়। ঘোষণাপত্রে জরিপ ও সমীক্ষার মাধ্যমে উপকূলরেখা ও উপকূলীয় এলাকার প্রকৃত আয়তন নির্ধারণ, স্বাদুপানি, কৃষিজমি, মৎস্যসম্পদ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের তথ্য সমন্বয়, ভূমির প্রকারভেদ অনুযায়ী ‘ল্যান্ড জোনিং’ ভিত্তিক পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
এছাড়া যে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য কঠোর পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, স্থানীয় জেলে-কৃষক-নারী ও তরুণদের ভূমিকার স্বীকৃতি দিয়ে সমাজভিত্তিক প্রাকৃতিক সম্পদ সহ-ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা প্রদান, লবণাক্রান্ত এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা, স্বাদুপানির উৎস সংরক্ষণ এবং সমাজভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। উপকূলের ঝুঁকি ও চাহিদা বিবেচনায় স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু তহবিল, ক্ষতি ও বিনষ্টি তহবিল (লস অ্যান্ড ড্যামেজ) এবং সবুজ অর্থায়ন নিশ্চিত করার দাবিও উঠে আসে।
ঘোষণাপত্রে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও আগামী জাতীয় নির্বাচনের পর দায়িত্ব গ্রহণকারী সরকারের কাছে এসব দাবি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে উপকূলের টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়, যাতে একটি সবুজ ও কার্বন-নিরপেক্ষ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হয়।
গত ১৩ থেকে ১৪ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই জাতীয় উপকূল সম্মেলনে জলবায়ু সহনশীলতা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, কমিউনিটি নেতৃত্ব, স্থায়িত্বশীল জীবিকা, সামাজিক সুরক্ষা, অন্তর্ভুক্তিমূলক কমিউনিটি বিনির্মাণ, ন্যায়সঙ্গত রূপান্তর, উদ্ভাবন, সামাজিক সমতা, আর্থিক কাঠামো এবং প্রাকৃতিক সম্পদকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব বিষয়ে একাধিক সমান্তরাল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে অতিথি ও প্যানেলিস্ট হিসেবে অংশ নেন কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক (জলবায়ু পরিবর্তন) মো. এনায়েত উল্লাহ, বন অধিদপ্তরের উপপ্রধান বন সংরক্ষক মো. জাহিদুল কবির, কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক কোস্ট রেজাউল করিম চৌধুরী, কর্মজীবী নারীর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক সানজিদা সুলতানা, স্রেডার সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলামসহ অনেকে।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন; পানি সম্পদ এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড নেটওয়ার্ক (প্রান) এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ২৬টি সংস্থার উদ্যোগে আয়োজিত এই সম্মেলনে দেশের উপকূলীয় ১৯টি জেলার কৃষি, পরিবেশ, খাদ্য নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও কমিউনিটি সক্ষমতা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, গবেষক, শিক্ষার্থী এবং উপকূলীয় সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীসহ আড়াইশোর বেশি অংশগ্রহণকারী সরাসরি অংশ নেন।


