
আধুনিক ব্যস্ত জীবনযাত্রা, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনপদ্ধতির কারণে বর্তমানে হৃদরোগ বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চ রক্তচাপ, অতিরিক্ত ট্রাইগ্লিসারাইড, ক্ষতিকর কোলেস্টেরল এবং শরীরে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন হৃদরোগের ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় কিছু পরিবর্তন এনে এবং পুষ্টিকর খাবার যুক্ত করে হৃদরোগের এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। সম্প্রতি স্বাস্থ্যবিষয়ক শীর্ষস্থানীয় পোর্টাল ‘হেলথলাইন’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে হৃদযন্ত্র সুস্থ ও সবল রাখার জাদুকরী ১৭টি খাবারের কথা তুলে ধরা হয়েছে, যা আমাদের হৃৎপিণ্ডকে সুরক্ষায় ঢাল হিসেবে কাজ করে।
হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে এবং কার্ডিওভাসকুলার বা হৃদ্নালীর কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে কোন খাবারগুলো সবচেয়ে বেশি কার্যকর, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. পাতাযুক্ত সবুজ শাকসবজি: পালং শাক, কেল এবং কলমি শাকের মতো পাতাযুক্ত সবুজ শাকসবজিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন কে এবং ডায়েটারি নাইট্রেট থাকে। ভিটামিন কে ধমনী সুরক্ষিত রাখতে এবং রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দেয়। অন্যদিকে নাইট্রেট উচ্চ রক্তচাপ কমাতে, ধমনীর নমনীয়তা বাড়াতে এবং রক্তনালীর কোষের কার্যকারিতা উন্নত করতে সাহায্য করে।
২. হোল গ্রেন বা পূর্ণ শস্য: লাল চালের ভাত, ওটস, বার্লি, কুইনোয়া এবং হোল হুইট ব্রেডের মতো পূর্ণ শস্যে ব্রান, জার্ম ও এন্ডোস্পার্ম—এই তিন পুষ্টিকর অংশই থাকে। পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ালেও, প্রতিদিন হোল গ্রেন খাওয়ার অভ্যাস করোনারি হৃদরোগের ঝুঁকি ১০% থেকে ২০% পর্যন্ত কমাতে সাহায্য করে।
৩. বেরি জাতীয় ফল: স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, ব্লাকবেরি এবং রাস্পবেরিতে রয়েছে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্থোসায়ানিন। এই উপাদানগুলো অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং প্রদাহ প্রতিহত করে। নিয়মিত বেরি খেলে রক্তচাপ ও রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমে।
৪. অ্যাভোকেডো: অ্যাভোকেডোতে রয়েছে প্রচুর হৃদবান্ধব মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং পটাশিয়াম। সপ্তাহে অন্তত দুই পরিবেশন অ্যাভোকেডো খাওয়া কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। এটি খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) ও ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে দারুণ কার্যকরী।
৫. চর্বিযুক্ত মাছ ও ফিশ অয়েল: স্যামন, ম্যাকারেল, সার্ডিন এবং ব্লুফিন টুনার মতো চর্বিযুক্ত মাছে প্রচুর ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। ওমেগা-৩ হৃদযন্ত্রের অ্যারিথমিয়া বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন এবং কার্ডিয়াক ডেথের ঝুঁকি কমাতে অত্যন্ত কার্যকর। মাছ খেতে না পারলে ফিশ অয়েল বা অ্যালগাল অয়েলও ভালো বিকল্প।
৬. আখরোট: আখরোট ফাইবার এবং ম্যাগনেসিয়াম, তামা ও ম্যাঙ্গানিজের মতো মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের দারুণ উৎস। এটি রক্তনালীর কার্যকারিতা উন্নত করে, রক্তচাপ কমায় এবং রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল (এলডিএল) ও মোট কোলেস্টেরলের মাত্রা হ্রাসে সাহায্য করে।
৭. বিনস বা ডাল জাতীয় খাবার: সাধারণ বিনস বা শুঁটিজাতীয় খাবার হজম স্বাস্থ্য ভালো রাখার পাশাপাশি হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে বেশ পরিচিত। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত বিনস খেলে ক্ষতিকর LDL কোলেস্টেরল উল্লেখযোগ্য হারে কমে এবং রক্তে শর্করা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে।
৮. ডার্ক চকলেট: কমপক্ষে ৭০ শতাংশ বা তার বেশি কোকোযুক্ত ডার্ক চকলেটে ফ্ল্যাভোনয়েডের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এটি রক্ত জমাট বাঁধা রোধ করতে, রক্তচাপ ও লিপিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। পরিমিত মাত্রায় (সপ্তাহে ৪৫ গ্রামের মতো) ডার্ক চকলেট খেলে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে।
৯. টমেটো: টমেটোতে রয়েছে লাইকোপেন নামক শক্তিশালী প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা কোষের ক্ষতি এবং প্রদাহ রোধ করে। নিয়মিত টমেটো বা টমেটো সস খাওয়ার অভ্যাস রক্তে ভালো কোলেস্টেরল (এইচডিএল) বাড়াতে এবং খারাপ কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে সাহায্য করে।
১০. কাঠবাদাম বা আমন্ড: কাঠবাদাম ভিটামিন, মিনারেল, ফাইটোস্টেরল এবং ফাইবারে ভরপুর। এটি শরীরের লিপিড প্রোফাইল উন্নত করে এবং ক্ষতিকর কোলেস্টেরল ও পেটের মেদ কমাতে সাহায্য করে। তবে ক্যালোরি বেশি থাকায় পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত।
১১. চিয়া বীজ: চিয়া বীজে প্রচুর পরিমাণে ডায়েটারি ফাইবার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে। এটি রক্তচাপ কমাতে, রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দিতে এবং ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অত্যন্ত কার্যকর।
১২. ফ্লাক্সসিড বা তিসি বীজ: ফ্লাক্সসিড হৃদযন্ত্রের সুরক্ষায় দারুণ উপকারী। নিয়মিত ডায়েটে ফ্লাক্সসিড যুক্ত করলে উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং সামগ্রিকভাবে কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি কমে।
১৩. হেম্প বীজ: হেম্প বীজ বা তিলজাতীয় এই বীজটিতে প্রচুর প্রোটিন এবং আর্জিনিন নামক অ্যামিনো অ্যাসিড রয়েছে। আর্জিনিন শরীরের বিভিন্ন প্রদাহজনিত মার্কারের মাত্রা কমিয়ে রক্তনালীর স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।
১৪. রসুন: রসুনে থাকা ‘অ্যালিসিন’ নামক বিশেষ উপাদানটির শক্তিশালী ঔষধি গুণ রয়েছে। এটি ধমনীতে প্লাক জমা হতে বাধা দেয় এবং উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল কমাতে প্রেসক্রিপশনের ওষুধের মতোই কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
১৫. জলপাই তেল বা অলিভ অয়েল: অলিভ অয়েল মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর। এটি শরীরের প্রদাহ কমাতে, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাসে অন্যান্য রান্নার তেলের তুলনায় অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর।
১৬. এডামামে বা কচি সয়াবিন: এডামামে হলো কচি সয়াবিন, যা এশিয়ান খাবারে বেশ জনপ্রিয়। এতে থাকা সোয়া আইসোফ্লেভোন রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল (এলডিএল) কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া এতে থাকা ফাইবার ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হৃদযন্ত্রের সুরক্ষায় কাজ করে।
১৭. গ্রিন টি: গ্রিন টি-তে প্রচুর পলিফেনল ও ক্যাটেচিন নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা কোষের ক্ষতি রোধ করে এবং প্রদাহ কমায়। নিয়মিত গ্রিন টি পান করলে বা এর নির্যাস গ্রহণ করলে রক্তচাপ, ট্রাইগ্লিসারাইড এবং ক্ষতিকর কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিনের পাতে প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে ভূমধ্যসাগরীয় ডায়েটের আদলে শাকসবজি, ফলমূল, হোল গ্রেন এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাট সমৃদ্ধ খাবার রাখলে কেবল হার্ট নয়, পুরো শরীরই সুস্থ রাখা সম্ভব। সচেতন খাদ্যাভ্যাসই পারে একটি দীর্ঘ, সুন্দর ও ঝুঁকিমুক্ত জীবন উপহার দিতে।