
প্রতি বছর ২২ জুলাই আন্তর্জাতিকভাবে উদযাপিত হয় ‘বিশ্ব আম দিবস’ (World Mango Day)। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফলের জগতে আম তার স্বাদ, সুবাস এবং বৈচিত্র্যের জন্য একক অধিপত্য বিস্তার করে আছে। রসে ভরা এই ফলটি কেবল স্বাদের জন্যই জনপ্রিয় নয়, বরং হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং মানুষের স্বাস্থ্যের সঙ্গে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে যুক্ত।

আমের বিজ্ঞানসম্মত নাম Mangifera indica। বোটানিক্যাল গবেষণা অনুযায়ী, আজ থেকে প্রায় ৫,০০০ বছর আগে দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-মালয় অঞ্চলে প্রথম আমের চাষ শুরু হয়। প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে একে ‘অম্ব’ বা ‘রসাল’ নামে ডাকা হতো। পরবর্তীতে মোগল সম্রাটদের হাত ধরে আমের বিস্তার ও নতুন জাতের বিকাশ ঘটে। বিশেষ করে সম্রাট আকবর বিহারের দরভাঙ্গায় এক লাখ আম গাছের ‘লাখী বাগ’ স্থাপন করেছিলেন। ১৫ ও ১৬ শতকে পর্তুগিজ বণিকদের মাধ্যমে এশিয়া থেকে আফ্রিকায় এবং পরবর্তীতে দক্ষিণ আমেরিকায় আমের বিস্তার ঘটে।
আমের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার লক্ষ্যেই ২২ জুলাই দিবসটি পালন করা হয়। ১৯৮৭ সালে ভারতের ‘ন্যাশনাল হর্টিকালচার বোর্ড’ আন্তর্জাতিক আম উৎসবের সূচনা করে, যা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিকভাবে আম দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ দিনটিতে আম প্রদর্শনী, আম বিষয়ক আলোচনা এবং নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে দিবসটি উদযাপিত হয়।
বর্তমানে বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে আম উৎপাদিত হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) তথ্যমতে, বিশ্বে প্রতি বছর আনুমানিক ৫ থেকে ৬ কোটি মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়। বিশ্বজুড়ে এককভাবে সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদন করে ভারত, যা বৈশ্বিক চাহিদার প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ পূরণ করে। এছাড়া চীন, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, মেক্সিকো ও ব্রাজিল শীর্ষ আম উৎপাদনকারী দেশগুলোর অন্যতম। বিশ্ব আম উৎপাদনে বাংলাদেশও প্রথম সারির ১০টি দেশের মধ্যে অবস্থান করছে।
বিশ্বজুড়ে আমের হাজারেরও বেশি জাত রয়েছে। বাংলাদেশে হিমসাগর (খীরসাপাত), ল্যাংড়া, আম্রপালি, ফজলি, গোপালভোগ ও হাঁড়িভাঙা অত্যন্ত জনপ্রিয়। আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের ‘আলফোনসো’ আম তার অতুলনীয় স্বাদ ও সুবাসের জন্য সুপরিচিত। অন্যদিকে, বাণিজ্যিক পরিবহনে স্থায়িত্বের কারণে আমেরিকা ও ইউরোপের বাজারে মেক্সিকোর ‘টমি অ্যাটকিন্স’ ও ‘কেট’ জাতের আম বহুল প্রচলিত। বর্তমানে জাপানের ‘মিয়াজাকি’ জাতের আম তার চমৎকার রং ও উচ্চ মিষ্টতার কারণে বিশ্বের অন্যতম দামি আম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
স্বাদের পাশাপাশি পুষ্টিগুণে আম অনন্য। পাকা আমে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, ভিটামিন এ, পটাসিয়াম এবং ডায়েটারি ফাইবার থাকে। এতে থাকা বিটা-ক্যারোটিন চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে এবং ত্বকের স্বাস্থ্য উন্নত করে। এছাড়া আমে উপস্থিত প্রাকৃতিক এনজাইম (যেমন অ্যামাইলেস) খাবার দ্রুত হজম করতে সাহায্য করে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
পরিশেষে বলা যায়, আম কেবল একটি ফল নয়, বরং এটি বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের খাদ্যাভ্যাস, অর্থনীতি ও কৃষির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ্ব আম দিবস আমাদের এই সুস্বাদু ফলের ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি আধুনিক কৃষিতথ্য ও প্রযুক্তির মাধ্যমে আমের উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহিত করে।