
খুলনা শহরের বাতাসে ধুলাবালি ও দূষণ হানা দিয়েছে নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়। সড়কে লাগাতার খোঁড়াখুঁড়ি, ড্রেনেজ সংস্কার, উন্নয়নকাজে অনিয়ম, যানবাহনের কালো ধোঁয়া এবং ইটভাটাসহ নানা কারণে শহরের বায়ুমান দীর্ঘদিন ধরে অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে খুলনার বাতাস অস্বাস্থ্যকর ছিল, যা নগরবাসীর জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
মহানগরজুড়ে ধুলাবালি ওড়ার দৃশ্য এখন দৈনন্দিন চিত্র। সড়কে নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা, ভাঙাচোরা সড়ক দীর্ঘদিন সংস্কার না করা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অব্যবস্থা বাতাসে ধূলিকণার পরিমাণ উদ্বেগজনকভাবে বাড়িয়েছে। খুলনা সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা ও সড়ক বিভাগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত নির্মাণকাজেও পরিবেশগত নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। যানবাহনের কালো ধোঁয়া, অবৈধ ইটভাটা ও শিল্পকারখানার ধোঁয়া বাতাসের দূষণ আরও বাড়াচ্ছে।

নগরবাসীর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। সোনাডাঙ্গার আব্দুল করিম বলেন, ধুলার কারণে ঘরবাড়ি সারাক্ষণ নোংরা থাকে, জানালা খোলা রাখা যায় না, শিশুদের শ্বাসকষ্ট ও সর্দি-কাশি বেড়ে গেছে। কবরখানার মোড়ের ব্যবসায়ী মনির হোসেন জানান, সারাদিন চোখ জ্বালা ও মাথাব্যথায় ভুগতে হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের বায়ুমান পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ১৫১–২০০ মাইক্রোগ্রাম ধূলিকণা অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত। নভেম্বর, ডিসেম্বর ও চলতি জানুয়ারিতে খুলনার বাতাস প্রায় প্রতিদিনই এই সীমার মধ্যে এবং একাধিক দিন তা ২০০ মাইক্রোগ্রাম ছাড়িয়ে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে পৌঁছেছে।

পরিবেশবিদদের মতে, দূষণকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা না নেওয়া, উন্নয়নকাজে সমন্বয়ের অভাব এবং দীর্ঘদিনের অবহেলা এই সমস্যার মূল কারণ। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, “পরিকল্পনা ছাড়া একসঙ্গে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে নগরবাসীকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।”
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী মশিউজ্জামান জানান, ভবিষ্যতে নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখা, পানি ছিটানো এবং কাজ শেষে দ্রুত সড়ক সংস্কারসহ ধুলা নিয়ন্ত্রণে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হবে। তবে পরিবেশ অধিদপ্তর সতর্ক করেছে, সংশ্লিষ্ট সংস্থার সহযোগিতা ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
আন্তঃদেশীয় দূষিত বাতাসও খুলনার দূষণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। জাইকা গবেষণা অনুযায়ী, সীমান্ত পেরিয়ে আসা দূষিত বাতাস খুলনার মোট বায়ুদূষণের ৩০–৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করছে। চিকিৎসকেরা সতর্ক করেছেন, দীর্ঘমেয়াদি দূষিত বায়ুর সংস্পর্শে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, ফুসফুস ও হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত না করা হলে খুলনায় বায়ুদূষণের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
তথ্যসুত্র: সময় টিভি