ঢাকাশনিবার , ৬ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ

লবণাক্ততার মরণফাঁদে সুন্দরবন

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
৬ জুন ২০২৬, ৫:৩৯ অপরাহ্ণ

Link Copied!

হাসান মাহমুদ: দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলজুড়ে নিঃশব্দে এক পরিবেশগত মড়ক ছড়িয়ে পড়ছে। সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের যে জনপদে এক দশক আগেও ছিল চিরসবুজ প্রাণের স্পন্দন, আজ সেখানে ধূসর মৃত্যুর অবর্ণনীয় রাজত্ব। দেখে যেন মনে হবে কেউ ইচ্ছা মানচিত্র থেকে মাইলের পর মাইল বৃস্তৃত সবুজ রঙটা দিয়েছে। ডালপালা ও পাতাহীন এই প্রাণহীন হাজার হাজার গাছের কঙ্কাল যেন এক জীবন্ত নরকের কড়া নাড়ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই চূড়ান্ত রূপকে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা সংজ্ঞায়িত করছেন ‘ঘোস্ট ফরেস্ট’ বা ‘প্রেতাত্মা বন’ হিসেবে। তারা বলছেন, এটি কোনো সাধারণ প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়; বরং জলবায়ু পরিবর্তনের এক নৃশংসতম পর্যায়, যেখানে একটি জীবন্ত উপকূলীয় বাস্তুসংস্থানকে জীবন্ত কবর দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিজ্ঞানীদের যৌথ গবেষণায় এই নীরব বন উজাড়ের পেছনে থাকা জলবায়ু সংকটের যে রোমহর্ষক চিত্র উঠে এসেছে, তা এক কথায় শিউরে ওঠার মতো। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, এই পরিবেশগত সুনামি এখনই ঠেকানো না গেলে, প্রেতাত্মা বনের এই করাল গ্রাস সুন্দরবনের মূল ভূখণ্ডকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেবে।

যৌথ গবেষণার সারসংক্ষেপ:
উপকূলীয় অঞ্চলের এই নীরব ও ধ্বংসাত্মক রূপান্তরের বৈজ্ঞানিক কার্যকারণ খোঁজার জন্য গত ২০ বছরে ধরে যৌথ গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি) এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়-এর পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের গবেষকরা এই যৌথ অনুসন্ধানটি চালান। অতি সম্প্রতি পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘এসটুয়ারিন, কোস্টাল অ্যান্ড শেল সায়েন্স’-এ গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়।

গবেষণার মূল বিষয়বস্তু হলো— উপকূলে ঘন ঘন আছড়ে পড়া ঘূর্ণিঝড় (যেমন- সিডর, আইলা, আম্পান, রেমাল) এবং সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে লোনা পানির যে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, তা উপকূলের বৃক্ষরাজিকে এক অদৃশ্য ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ বা জৈবিক মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গাছগুলো বাইরে থেকে সবুজ দেখা গেলেও ভেতরের রক্তনালী বা জাইলেম টিস্যু ব্লক হয়ে যাওয়ার কারণে সেগুলো ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে, যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটছে এই ‘ঘোস্ট ফরেস্ট’ তৈরির মাধ্যমে।

#জলবায়ুর প্রভাবে উপকূলে জন্ম নিচ্ছে কঙ্কালসার ‘প্রেতাত্মা বন’
# দীর্ঘস্থায়ী লোনা জলাবদ্ধতায় গাছের জাইলেম টিস্যু ব্লক হচ্ছে
# গত ২০ বছরে উপকূলীয় মাটির লবণাক্ততা বেড়েছে ৩৫-৪০%
# সাতক্ষীরার ২২% সামাজিক বনায়ন পাতা হারিয়ে কঙ্কালে পরিণত
# সুন্দরবনের ১৫-১৮% বাফার জোন ইতিমধ্যেই মড়কে আক্রান্ত
# বন উধাও হওয়ায় উপকূলে তীব্র আর্দ্র তাপপ্রবাহ তৈরি হচ্ছে
# মিষ্টি পানির প্রবাহ না বাড়লে সুন্দরবন শ্মশানে পরিণত হবে

গবেষণার তথ্য সংগ্রহ ও নেতৃত্ব:
অত্যন্ত সংবেদনশীল এই গবেষণায় বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছেন খুবির পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ও প্রখ্যাত লোনা পানি গবেষক ড. তানভীর আহমেদ এবং সহযোগী গবেষক হিসেবে ছিলেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ ডিসিপ্লিনের ড. রেহানা পারভীন। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে উন্নত স্যাটেলাইট ডাটা অ্যানালাইসিস এবং থার্মাল ম্যাপিংয়ের কারিগরি নেতৃত্বে ছিলেন ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ইকোলজিক্যাল ডাইনামিক্স’ ল্যাবের প্রধান অধ্যাপক ড. ডেভিড এস. মিলার এবং তার পিএইচডি গবেষক দল।

গবেষণায় স্যাটেলাইট থার্মাল ইমেজিং, গত দুই দশকের (২০০৪ থেকে ২০২৪ সাল) রিমোট সেন্সিং ডাটা বিশ্লেষণ এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি ও বাগেরহাটের শরণখোলা অঞ্চলের মাঠপর্যায়ের মাটির গভীর থেকে সংগৃহীত নমুনার ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় মাটির লবণাক্ততা গত ২০ বছরে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা উদ্ভিদের বেঁচে থাকার জন্য চরম প্রতিকূল।

গবেষক দলটির সদস্যরা দীর্ঘ ১৮ মাস ধরে সাতক্ষীরার সুন্দরবন সংলগ্ন বুড়িগোয়ালিনী, গাবুরা, পদ্মপুকুর এবং বাগেরহাটের শরণখোলার বলেশ্বর নদী তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ করেছেন। তারা গাছের কলার নমুনা সংগ্রহ করে তা ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নত ল্যাবে পরীক্ষা করেছেন, যাতে করে গাছ মারা যাওয়ার সঠিক সেলুলার বা কোষীয় কারণটি নিশ্চিত করা যায়।

‘ঘোস্ট ফরেস্ট’ আসলে কী?:
উদ্ভিদ বিজ্ঞান এবং পরিবেশবিদ্যার পরিভাষায় ‘ঘোস্ট ফরেস্ট’ বা প্রেতাত্মা বন একটি সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক সংকট। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে যখন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পায়, তখন জোয়ারের তীব্র লোনা পানি নদী ও খালের মাধ্যমে উপকূলের মূল স্থলভাগের অনেক গভীরে প্রবেশ করে। দীর্ঘ সময় ধরে এই লোনা পানি জমে থাকার কারণে তা মাটির নিচে চুঁইয়ে ভূগর্ভস্থ স্বাদু পানির স্তরের সাথে মিশে যায় এবং মাটির স্বাভাবিক গুণাগুণ সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয়।

এর ফলে মাটির গভীরের লবণাক্ততা বা সোডিয়াম ক্লোরাইডের মাত্রা উদ্ভিদের সহ্যক্ষমতার বাইরে চলে যায়। অতিরিক্ত লবণের এই আগ্রাসনে বনের গাছগুলো তাদের স্বাভাবিক পুষ্টি ও পানি শোষণ প্রক্রিয়া হারিয়ে ফেলে। একপর্যায়ে গাছের অভ্যন্তরীণ কোষগুলো মারা যায়, পাতা ঝরে পড়ে এবং কাণ্ড শুকিয়ে সাদাটে বা ধূসর বর্ণ ধারণ করে। তবে উপকূলীয় অঞ্চলের কাদা ও নরম মাটির গভীরে গাছের মূল বা শিকড়গুলো শক্তভাবে গেঁথে থাকার কারণে, গাছটি পুরোপুরি মারা যাওয়ার পরও সহজে মাটিতে ভেঙে পড়ে না। বছরের পর বছর ধরে এই মৃত, পাতাহীন গাছগুলো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন একটি বিশাল বন দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু বাস্তবে তার ভেতরে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব নেই। বনের এই কঙ্কালসার ও ভুতুড়ে রূপের কারণেই একে বিশ্বজুড়ে ঘোস্ট ফরেস্ট বা প্রেতাত্মা বন বলা হচ্ছে।

গবেষণার ফলাফল:
যৌথ গবেষণাপত্রে উপকূলের ধ্বংসযজ্ঞের কিছু সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান ও ফলাফল তুলে ধরা হয়েছে। সেগুলো হলো-

মাটির লবণাক্ততার লম্ফঝম্প: সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি এবং বাগেরহাটের শরণখোলা অঞ্চলে মাটির ইলেকট্রিক্যাল কন্ডাক্টিভিটি (ইসি)—যা লবণাক্ততা পরিমাপের একক—তা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাভাবিক মাটিতে যেখানে এটি ২ থেকে ৪ ডিএস/এম হওয়ার কথা, উপকূলের এই অঞ্চলগুলোতে তা ২০ ডিএস/এম ছাড়িয়ে গেছে।

ম্যানগ্রোভের সহ্যক্ষমতা লোপ: সুন্দরবনের সুন্দরী ও কেওড়া গাছ সাধারণত কিছুটা লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। কিন্তু গবেষণার ফলাফল বলছে, বর্তমান লবণাক্ততার মাত্রা এই গাছগুলোর সর্বোচ্চ সহ্যক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে কেওড়া এবং সুন্দরী গাছ এই লবণাক্ততার আগ্রাসনে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এবং দ্রুত ‘ঘোস্ট ফরেস্ট’-এ পরিণত হচ্ছে।

শতকরা হারের ভয়াবহতা: গত দুই দশকে সাতক্ষীরা জেলার উপকূলবর্তী প্রায় ২২ শতাংশ সামাজিক বনায়ন এবং প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বনের গাছ সম্পূর্ণ পাতা হারিয়ে কঙ্কালে পরিণত হয়েছে। বাগেরহাটের শরণখোলা অংশে এই হার প্রায় ১৪ শতাংশ।

ভূগর্ভস্থ স্বাদু পানির অবসান: মাটির ওপরের লোনা পানি চুঁইয়ে মাটির নিচে চলে যাওয়ার কারণে উদ্ভিদের শিকড় যে গভীরতা থেকে স্বাদু পানি সংগ্রহ করত, সেই স্তরটি এখন সম্পূর্ণ লোনা হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি ছাড়া এই গাছগুলোর বেঁচে থাকার আর কোনো প্রাকৃতিক উৎস অবশিষ্ট নেই।

ধ্বংসাত্মক চেইন রিঅ্যাকশন:
গবেষণায় দেখা গেছে, এই ‘ঘোস্ট ফরেস্ট’ বা স্থলভাগের বিপর্যয়টি একক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরো উপকূলীয় বাস্তুসংস্থানের এক ভয়ংকর ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া বা চেইন রিঅ্যাকশন।

আর্দ্র তাপপ্রবাহের সৃষ্টি: সবুজ বন উধাও হয়ে যাওয়ার কারণে এই অঞ্চলগুলোতে স্থানীয় তাপমাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। গাছ না থাকায় বাতাস তার আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারছে না, ফলে উপকূলে তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী ‘আর্দ্র তাপপ্রবাহ’ তৈরি হচ্ছে, যা মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছে।

মাটির ক্ষয় ও বেড়িবাঁধের দুর্বলতা: মৃত গাছগুলোর শিকড় আলগা হয়ে যাওয়ার কারণে উপকূলের নরম মাটি তার বাঁধুনি হারিয়ে ফেলছে। এর ফলে সামান্য জোয়ারের চাপেই নদীভাঙন তীব্র হচ্ছে এবং কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বেড়িবাঁধগুলো সহজেই ভেঙে যাচ্ছে।

কৃষিজমির স্থায়ী বন্ধ্যাত্ব: প্রেতাত্মা বনের চারপাশের কৃষিজমিগুলোতে লবণের সাদা আস্তরণ পড়ে যাচ্ছে। বনের গাছ মরে যাওয়ার কারণে মাটির উপকারী ব্যাকটেরিয়া (মাইক্রো-বায়োটা) তীব্র তাপে ও লবণে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, যা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ফসলী জমিকে চিরদিনের জন্য বন্ধ্যা করে দিচ্ছে।

গবেষকদের বক্তব্য ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা:
গবেষণা দলের প্রধান অধ্যাপক ড. তানভীর আহমেদ বনের কঙ্কালসার হয়ে ওঠার পেছনে থাকা জৈবিক কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, আমরা যখন ল্যাবে মৃত ও মৃতপ্রায় গাছগুলোর ডালপালা এবং কাণ্ডের ভেতরের অংশ পরীক্ষা করি, তখন উদ্ভিদের ‘জাইলেম’ টিস্যুর মধ্যে লবণের এক বিশাল আস্তরণ বা ক্রিস্টাল জমা হতে দেখি। উদ্ভিদের এই জাইলেম টিস্যুর মূল কাজ হলো মানুষের রক্তনালীর মতো মাটির গভীর থেকে পানি ও খনিজ উপাদান পাতায় পৌঁছে দেওয়া, যেখানে সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে গাছের খাদ্য তৈরি হয়। কিন্তু মাটির অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে গাছ যখন অতিরিক্ত লোনা পানি শোষণ করে, তখন সেই সোডিয়াম ক্লোরাইড জাইলেম টিস্যুকে পুরোপুরি ব্লক বা অবরুদ্ধ করে দেয়। একে উদ্ভিদের পরিভাষায় ‘এমবোলিজম’ বলা যেতে পারে। ফলাফলস্বরূপ, গাছটি তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ে এবং মাটি থেকে কোনো পুষ্টি নিতে পারে না। পাতাগুলো তার ক্লোরোফিল হারিয়ে ঝরে যায় এবং গাছটি দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই ভেতর থেকে শুকিয়ে মারা যায়। এটি অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও ধীরগতির এক জৈবিক মৃত্যু।

যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ডেভিড এস. মিলার তার ইমেইল সাক্ষাৎকারে বলেন, আমাদের স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং ডাটা দেখাচ্ছে যে, সুন্দরবনের সীমান্তবর্তী প্রায় ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ বাফার জোন (সীমান্তবর্তী এলাকা) ইতিমধ্যে এই ‘ঘোস্ট ফরেস্ট’ সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্রতা যে গতিতে বাড়ছে, তাতে এই প্রেতাত্মা বনের পরিধি প্রতি বছর জ্যামিতিক হারে সম্প্রসারিত হচ্ছে। এটি কেবল বাংলাদেশের স্থানীয় কোনো ক্ষতি নয়, বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের সুরক্ষাকবচ ভেঙে পড়ার এটি একটি প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক আলামত।

এদিকে উপকূলের এই ভয়াবহ রূপান্তর নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় পরিবেশ বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। খ্যাতনামা পরিবেশ গবেষক, নদী বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত এই পরিস্থিতির গভীরতা তুলে ধরে বলেন, ঘোস্ট ফরেস্ট হলো জলবায়ু পরিবর্তনের একটি অত্যন্ত দৃশ্যমান এবং জীবন্ত ট্রাজেডি। সুন্দরবন এবং এর চারপাশের এলাকা আমাদের প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচ। আমরা যদি ফারাক্কা বা অন্যান্য উজান থেকে আসা নদীগুলোর মাধ্যমে উপকূলের দিকে মিষ্টি পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে না পারি, তবে সমুদ্রের লোনা পানির এই আগ্রাসন আমাদের পুরো উপকূলকে গ্রাস করবে। আগামী কয়েক দশকে সুন্দরবনের একটা বড় অংশ কেবল মৃত গাছের কঙ্কালে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এটি ঠেকানোর জন্য আমাদের প্রচলিত বনায়ন ও অভিযোজন (অ্যাডাপটেশন) কৌশলে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু ঢালাওভাবে গাছ লাগালেই হবে না, কোন কোন গাছ ক্রমবর্ধমান লোনা পানিতে টিকবে, তা বৈজ্ঞানিক উপায়ে নির্ধারণ করে বনায়ন করতে হবে।

অন্যদিকে, বিএমডির জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বনের এই ধ্বংসযজ্ঞের সাথে জলবায়ুর পরিবর্তনের সম্পর্ক তুলে ধরে বলেন, আমরা স্পষ্ট দেখছি যে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে আর্দ্র তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব এবং তীব্রতা দুটিই প্রতি বছর বাড়ছে। আগে যেখানে তাপপ্রবাহ ২ থেকে ৩ দিন স্থায়ী হতো, এখন তা টানা ১৫ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত চলছে। এই তীব্র গরম এবং মাটির নিচের লবণাক্ততার দ্বিমুখী আক্রমণ কেবল মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যই ক্ষতিকর নয়, বরং আমাদের প্রকৃতির ফুসফুস বনাঞ্চলের জন্যও চরম এক বিপর্যয়। এই দ্বিমুখী আক্রমণ উপকূলকে দ্রুত বসবাসের অনুপযোগী এবং মরুময়তায় রূপান্তর করছে।

গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ:
খুলনা ও ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল এবং দেশের পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা এই ঘোস্ট ফরেস্ট বা বাস্তুসংস্থানের মহাবিপর্যয় রোধে জরুরি ভিত্তিতে সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছেন।

লবণাক্ততা সহিষ্ণু বনায়ন: প্রচলিত সুন্দরী বা কেওড়া গাছ যেগুলো অতিরিক্ত লবণে মারা যাচ্ছে, সেগুলোর পরিবর্তে উচ্চ লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে এমন আদি ও নতুন প্রজাতির উদ্ভিদের জিনগত উন্নয়ন ঘটিয়ে উপকূলীয় অঞ্চলে রোপণ করতে হবে। যেমন—গোলপাতা, বাইন বা গেওয়া গাছের মতো প্রজাতিগুলোর চাষ বাড়াতে হবে।

নদী খনন ও মিষ্টি পানির প্রবাহ বৃদ্ধি: গঙ্গা ও এর শাখা নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য অবিলম্বে ক্যাপিটাল ড্রেজিং বা নদী খনন কার্যক্রম শুরু করতে হবে। উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পেলে তা সমুদ্রের লোনা পানির ধাক্কাকে প্রাকৃতিকভাবেই ঠেলে সাগরের দিকে ফিরিয়ে দেবে, যা মাটির লবণাক্ততা দ্রুত কমিয়ে আনবে।

ইকো-সিস্টেম রেস্টোরেশন ফান্ড গঠন: সুন্দরবন ও সংলগ্ন বাফার জোনের ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুসংস্থানকে কৃত্রিমভাবে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য একটি বিশেষ ‘ইকো-সিস্টেম রেস্টোরেশন ফান্ড’ গঠন করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিপূরণ হিসেবে আন্তর্জাতিক গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) থেকে অর্থ এনে এই জোনে বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে মাটির লবণাক্ততা কমানোর পাইলট প্রজেক্ট হাতে নিতে হবে।

সামাজিক বনায়ন নীতির আধুনিকায়ন: উপকূলীয় এলাকায় যত্রতত্র চিংড়ি ঘের তৈরি করে লোনা পানি আটকে রাখার যে প্রবণতা, তা আইন করে কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। সামাজিক বনায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে এমন গাছ লাগাতে হবে যা মাটির নাইট্রোজেন ধরে রাখতে সাহায্য করে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

সোনারগাঁয়ে কাভার্ড ভ্যান উল্টে চালক নিহত

মোটরসাইকেলের ধাক্কায় আহত অটোভ্যান চালকের মৃত্যু

আগামী ৭-১০ জুন যেমন থাকতে পারে দেশের আবহাওয়া

জলবায়ু সুরক্ষায় এখনই পদক্ষেপ: তামাকমুক্ত পরিবেশ গড়ি, টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করি

আজ যেমন থাকবে ঢাকার আবহাওয়া

বিশ্বের তৃতীয় দূষিত শহর ঢাকা, বায়ুমান অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে

তামাকপণ্যে সুনির্দিষ্ট কর ও জর্দা-গুলে আধুনিক কর ব্যবস্থা চালুর দাবি

এবারের ডেঙ্গু হতে পারে আরও ভয়াবহ, রক্তক্ষরণের আশঙ্কার কথা জানালেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী

কুমিল্লায় দাঁড়িয়ে থাকা বাসে মোটরসাইকেলের ধাক্কা, নিহত ২

মহাখালীতে বাস উল্টে প্রাণ গেল নবনিযুক্ত হেলপারের

Apex Footwear secures triple win for Bangladesh at Retail Asia Awards 2026

তিন ক্যাটাগরিতে রিটেইল এশিয়া অ্যাওয়ার্ডস পেল এপেক্স ফুটওয়্যার