ঢাকাশনিবার , ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. নিরাপদ খাদ্য
  3. লাইফস্টাইল

বিশ্বজুড়ে আমের রাজত্ব: উৎপাদনে ৭ম বাংলাদেশ, শীর্ষে কারা?

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
১৫ জুন ২০২৬, ৪:১৪ বিকাল

Link Copied!

বিপ্লব হোসাইন: আমকে বলা হয় ‘ফলের রাজা’। অতুলনীয় স্বাদ, মনভোলানো গন্ধ এবং উচ্চ পুষ্টিগুণের কারণে বিশ্বজুড়ে আমের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এই ফলটির উৎপত্তি দক্ষিণ এশিয়ায় হলেও, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১০০টিরও বেশি উষ্ণমণ্ডলীয় দেশে এর ব্যাপক চাষ হচ্ছে। বৈশ্বিক কৃষি অর্থনীতিতে আমের বিশাল অবদান রয়েছে। সারা বিশ্বের আম উৎপাদন, বাণিজ্য, বৈচিত্র্য এবং এর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ও সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

বিশ্ব আম উৎপাদন ও শীর্ষ ১০ দেশের অবস্থান
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং বৈশ্বিক কৃষি পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে আম উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি চমৎকার চিত্র ফুটে ওঠে।

অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানে ভারত (১ম): আম উৎপাদনের ক্ষেত্রে পুরো বিশ্বে ভারতের কোনো কাছাকাছি প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। প্রতি বছর প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টন আম উৎপাদন করে ভারত বিশ্বতালিকায় অবিসংবাদিতভাবে শীর্ষস্থান দখল করে আছে। পৃথিবীর মোট আমের প্রায় ৪৬ শতাংশই এককভাবে ভারতে উৎপাদিত হয়।

চীন, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান (২য়, ৩য় ও ৪র্থ): ভারতের পর বিশাল ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন। দেশটিতে প্রতি বছর প্রায় ৬০ লাখ টন (বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ১১%) আম উৎপাদিত হয়। এরপরই রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুই দেশ থাইল্যান্ড (৩৭ লাখ টন বা ৭%) এবং ইন্দোনেশিয়া (৩৬ লাখ টন বা ৬.৭%)।

পাকিস্তান ও মেক্সিকো (৫ম ও ৬ষ্ঠ): আম উৎপাদনে পঞ্চম ও ষষ্ঠ স্থানে থাকা পাকিস্তান এবং মেক্সিকোর উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় কাছাকাছি। দেশ দুটির প্রতিটিতেই বছরে আনুমানিক ১৮ লাখ টন আম উৎপাদিত হয় এবং বৈশ্বিক উৎপাদনে উভয় দেশেরই অবদান প্রায় ৩.৩ শতাংশ করে।

বাংলাদেশের গৌরবজনক অবস্থান (৭ম): ভৌগোলিক আয়তনে ছোট দেশ হলেও আম উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা দখল করে আছে। প্রতি বছর প্রায় ১৬ লাখ টন আম উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম অবস্থানে রয়েছে, যা বৈশ্বিক আম উৎপাদনের প্রায় ৩.০ শতাংশ।

ব্রাজিল, মিশর ও নাইজেরিয়া (৮ম, ৯ম ও ১০ম): শীর্ষ দশের শেষের তিনটি স্থানে রয়েছে লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার দেশ। ব্রাজিল বার্ষিক ১৫ লাখ টন (২.৮%) উৎপাদন করে অষ্টম, মিশর ১৩ লাখ টন (২.৪%) উৎপাদন করে নবম এবং নাইজেরিয়া ১০ লাখ টন (১.৯%) উৎপাদন করে দশম স্থানে অবস্থান করছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে আমের বৈচিত্র্য ও বাণিজ্য
বিশ্বে আমের হাজারো জাত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সবচেয়ে সমাদৃত জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারতের আলফনসো, মেক্সিকোর আতাউলফো, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় উদ্ভাবিত কেন্ট ও কিট, এবং পাকিস্তানের সিন্ধ্রি ও চৌনসা। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় টমি অ্যাটকিন্স আমটি, কারণ এর সংরক্ষণের মেয়াদ (শেলফ-লাইফ) তুলনামূলক বেশি।

বিশ্ব বাণিজ্যের কিছু চমকপ্রদ তথ্য হলো, ভারত বিশ্বের প্রায় অর্ধেক আম উৎপাদন করলেও নিজেদের দেশে বিপুল চাহিদার কারণে তারা এর ১ শতাংশেরও কম রপ্তানি করে। অন্যদিকে, মেক্সিকো উৎপাদনে ৬ষ্ঠ হলেও তারা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আম রপ্তানিকারক দেশ। আবার, আম রপ্তানি থেকে আয়ের দিক দিয়ে থাইল্যান্ড বিশ্বে প্রথম সারিতে রয়েছে, কারণ তাদের ‘নাম ডক মাই’ জাতের আম জাপান বা ইউরোপের মতো উন্নত দেশগুলোতে অত্যন্ত চড়া দামে বিক্রি হয়।

বাংলাদেশের আমের অঞ্চল ও বিখ্যাত জাতসমূহ
বাংলাদেশের সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং ঐতিহ্যের সাথে আম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার একর জমিতে আমের বাগান রয়েছে।

প্রধান উৎপাদনকারী অঞ্চল: একসময় রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জকে ‘আমের রাজধানী’ বলা হলেও বর্তমানে নওগাঁ জেলা দেশের সবচেয়ে বড় আম উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরা ও যশোরে আগাম জাতের আম উৎপাদিত হয়, যা সবার আগে বাজারে আসে। অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতেও এখন আধুনিক পদ্ধতিতে আমের বাম্পার ফলন হচ্ছে।

বিখ্যাত জাতসমূহ: বাংলাদেশে প্রায় আড়াইশো থেকে তিনশো জাতের আম পাওয়া যায়। এর মধ্যে ক্ষীরশাপাত (হিমসাগর) ও ফজলি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং বাংলাদেশের পণ্য হিসেবে জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেশন বা জিআই (GI) স্বীকৃতি পেয়েছে। এছাড়া পাতলা খোসার ল্যাংড়া, রংপুরের বিখ্যাত হাঁড়িভাঙ্গা, এবং অত্যন্ত সুমিষ্ট হাইব্রিড জাত আম্রপালি দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) উদ্ভাবিত ‘বারি-৪’ এবং বারোমাসি ‘বারি-১১’ জাত দুটিও বর্তমানে বেশ সাড়া ফেলেছে।

নতুন প্রযুক্তি ও রপ্তানি সম্ভাবনা
উৎপাদনে বিশ্বে ৭ম স্থানে থাকলেও বাংলাদেশ এখনো শীর্ষ আম রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হতে পারেনি। তবে আশার কথা হলো, বর্তমানে দেশের চাষিরা ‘ফ্রুট ব্যাগিং’ (Fruit Bagging) পদ্ধতির মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। এই পদ্ধতিতে আম গাছে থাকা অবস্থায় বিশেষ ব্যাগে মুড়িয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে আমে কোনো পোকা বা দাগ থাকে না এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক স্প্রে করার প্রয়োজন হয় না, যা রপ্তানির পূর্বশর্ত।

বর্তমানে যুক্তরাজ্য, ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্সসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের আম রপ্তানি হচ্ছে। বিশেষ করে সাতক্ষীরার গোবিন্দভোগ এবং হিমসাগর আম ইউরোপের বাজারে ক্রেতাদের বেশ নজর কেড়েছে।

আমের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা
আম শুধু স্বাদেই সেরা নয়, এটি পুষ্টিগুণেও ভরপুর একটি ফল:

ভিটামিন ও খনিজ: আমে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই এবং বি-কমপ্লেক্স রয়েছে। পাশাপাশি এতে প্রয়োজনীয় পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম থাকে।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট: আমে থাকা পলিফেনল এবং ‘ম্যাংগিফেরিন’ নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কোষকে ক্ষতিকর ফ্রি র‍্যাডিকেলের হাত থেকে রক্ষা করে।

হজমশক্তি ও রোগ প্রতিরোধ: আমে থাকা ডায়াটারি ফাইবার হজম প্রক্রিয়াকে উন্নত করে এবং উচ্চমাত্রার ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে।

পরিশেষে বলা যায়, সারা বিশ্বের ফলবাজারে আমের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। বাংলাদেশের উর্বর মাটি ও অনুকূল আবহাওয়া আম চাষের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ, উন্নত জাতের উদ্ভাবন এবং সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রাখলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে বিশ্ববাজারে আম রপ্তানিতে একটি বিশাল পরাশক্তিতে পরিণত হতে পারবে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

টিসিবির কার্যক্রমে ডিজিটাল রূপান্তর, সাশ্রয় হবে ৩০০-৩৫০ কোটি টাকা

দুর্গম এলাকায় চিকিৎসাসেবা দিতে ভাসমান হাসপাতাল ‘স্বাস্থ্য তরী’ নির্মাণ করবে সরকার

চীনে বাংলাদেশি রোগীদের চিকিৎসায় বিশেষ সুবিধার ঘোষণা

বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা, সম্ভাব্য নাম ‘অর্নব’

‘সমন্বিত জলবায়ু পদক্ষেপ’ রক্ষা করতে পারে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ

২০২৬ সালের ১২ সিনেমায় ৭৫১ বার দেখানো হয় ধূমপান ও তামাক ব্যবহারের দৃশ্য

রাজস্ব বৃদ্ধি ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় জাতীয় তামাক কর নীতি প্রণয়ন জরুরি

চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে কুষ্টিয়ায় ফের বিএটিবি কর্মীদের মানববন্ধন

ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরকে প্রযুক্তি ও জনবলে শক্তিশালী করা হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী

হাওরে হাঁস চড়াতে গিয়ে বজ্রপাতে যুবকের মৃত্যু

টিসিবির কার্যক্রমে আসছে ডিজিটাল নজরদারি, বাদ ৫৯ লাখ অযোগ্য আবেদনকারী

আগামী মাসে রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে যাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ: রুশ রাষ্ট্রদূত