ঢাকাবুধবার , ৪ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ

প্লাস্টিকের ছোবল: শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত নীরব ঘাতক

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
৮ অগাস্ট ২০২৫, ১২:০৫ বিকাল

Link Copied!

একটি শিশুর জন্ম হয়। সে পৃথিবীতে চোখ মেলে দেখে মা, প্রকৃতি, আলো, বাতাস। কিন্তু তার শ্বাস-প্রশ্বাসে, তার দুধে, এমনকি তার রক্তেও ঢুকে পড়ছে ক্ষুদ্র, অদৃশ্য, অথচ প্রাণঘাতী এক উপাদান— প্লাস্টিক। প্লাস্টিক এখন কেবল পণ্যের মোড়ক নয়, এটি হয়ে উঠেছে আমাদের শরীরের অদৃশ্য এক অংশ, এক মরণফাঁদ।

বিশ্ব এখন এক ভয়াবহ প্লাস্টিক সংকটে পড়েছে—এমনটাই জানিয়েছে সদ্য প্রকাশিত The Lancet–এ প্রকাশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা। এতে বলা হয়েছে, প্লাস্টিকের কারণে বিশ্বের স্বাস্থ্য খাতে প্রতিবছর কমপক্ষে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে।

প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ছে অকল্পনীয় গতিতে। ১৯৫০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এর উৎপাদন বেড়েছে ২০০ গুণ। বিশেষ করে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক যেমন পানির বোতল, খাবারের প্যাকেট, প্লাস্টিক চামচ—এসবই এখন প্লাস্টিক দূষণের মূল উৎসে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে ইতোমধ্যে ৮ বিলিয়ন টনের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয়ে গেছে, যা পৌঁছে গেছে এভারেস্টের চূড়া থেকে শুরু করে মহাসাগরের গভীরতম তলদেশ পর্যন্ত। এর মধ্যে শুধুমাত্র ১০ শতাংশের কম রিসাইকেল হয়।

প্লাস্টিকের ছায়া: জীবনের প্রতিটি ধাপে
গবেষণায় বলা হয়েছে, প্লাস্টিক মানুষের এবং পরিবেশের ওপর আঘাত করে জীবনের প্রতিটি স্তরে- যখন এটি তৈরি হয়, যখন আমরা এটি ব্যবহার করি, এমনকি যখন আমরা এটি ফেলে দিই।

প্লাস্টিক তৈরি করতে লাগে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও কয়লা—এই প্রক্রিয়ায় বিপুল কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করে। বর্তমানে প্রতি বছর ২ বিলিয়ন টন কার্বন নির্গত হয় প্লাস্টিক উৎপাদন থেকে, যা রাশিয়ার মোট নির্গমনের চেয়েও বেশি।

প্লাস্টিক পোড়ানো হয়, যেগুলোর অর্ধেকই খোলা জায়গায়—এর ফলে তৈরি হয় বায়ু দূষণ। সেই সঙ্গে এটি তৈরি করে হাজার হাজার বিষাক্ত রাসায়নিক—যেমন ফিলার, রং, আগুন প্রতিরোধক, স্ট্যাবিলাইজার ইত্যাদি—যেগুলোর অনেকগুলোই মানুষের শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

মাতৃগর্ভেই শুরু হয় ক্ষতি
গবেষণা আরও জানায়, ভ্রূণ, শিশু ও কিশোররা প্লাস্টিকের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। গর্ভপাত, অপরিণত জন্ম, বিকলাঙ্গতা, শ্বাসযন্ত্রের জটিলতা, এমনকি শিশুকালীন ক্যানসার পর্যন্ত এর সাথে সম্পর্কযুক্ত।

প্লাস্টিক ভেঙে তৈরি হয় মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক, যা আমাদের পানিতে, খাবারে, এমনকি বাতাসেও মিশে গেছে। গবেষণায় এগুলো পাওয়া গেছে— রক্তে, মস্তিষ্কে, দুধে, প্লাসেন্টায়, বীর্যে, এবং হাড়ের মজ্জায়।

এখনও পুরোপুরি বোঝা না গেলেও, এগুলোর সাথে হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং ক্যানসারের মতো রোগের সম্পর্ক পাওয়া যাচ্ছে।

‘রিসাইকেল’ দিয়ে সমাধান নয়
অনেকে বলেন, রিসাইকেল করলেই তো হলো! কিন্তু গবেষণা বলছে, প্লাস্টিক কাঁচামালের জটিলতা এবং রাসায়নিক বৈচিত্র্যের কারণে তা সহজে পুনঃব্যবহারযোগ্য নয়। কাঁচ, কাগজ, ধাতুর মতো সহজে রিসাইকেল হয় না প্লাস্টিক।

এখন সত্যিটা হচ্ছে—পৃথিবী আর “রিসাইকেল করে” প্লাস্টিক সংকট থেকে মুক্তি পাবে না।

প্লাস্টিক নয়, কর্পোরেট লোভ
এতকিছুর পরেও কিছু পেট্রোস্টেট (তেলনির্ভর রাষ্ট্র) এবং প্লাস্টিক লবি চায় না প্লাস্টিক উৎপাদনে সীমা টানা হোক। তারা এখনো জোর দিয়ে বলছে—রিসাইকেল করলেই হবে। এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যখন গার্ডিয়ান পত্রিকা প্রকাশ করে, কিভাবে প্লাস্টিক লবি ও কিছু রাষ্ট্র জাতিসংঘের প্লাস্টিক চুক্তি নিয়ে চলা আলোচনা নস্যাৎ করে দিতে চায়।

অসুস্থ গ্রহ, ব্যয়বহুল চিকিৎসা
প্লাস্টিককে আমরা সস্তা বলেই জানি। কিন্তু চিকিৎসা ব্যয়ের হিসেব করলে এটা সবচেয়ে ব্যয়বহুল। মাত্র তিনটি রাসায়নিক—PBDE, BPA এবং DEHP এর কারণে ৩৮টি দেশে প্রতি বছর ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ স্বাস্থ্য ক্ষতি হয়।

এটিই ছিল এই বিশ্লেষণের মূল সতর্কবার্তা—প্লাস্টিক কেবল দূষণ নয়, এটি একটি মানবিক সংকট। এটি একটি নতুন প্রজন্মকে গর্ভাবস্থাতেই অসুস্থ করে দিচ্ছে, এটি আমাদের জীবদ্দশার প্রতিটি পর্বে বিষ ঢেলে যাচ্ছে।

সমাধান কী?
এই রিপোর্টটি The Lancet–এ প্রকাশিত একটি ধারাবাহিক বিশ্লেষণের সূচনা মাত্র। আগামীতে আরও গবেষণা আসবে, যা নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা তৈরিতে সহায়তা করবে।

প্রফেসর ফিলিপ ল্যান্ড্রিগান, যিনি এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন, বলেছেন— “আমরা জানি প্লাস্টিক কী ধরনের ক্ষতি করে। এখন আমাদের করণীয়—কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ।”

তাঁর মতে, এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে শিশু ও গরিব জনগোষ্ঠীর ওপর। তাই প্লাস্টিক নিয়ে বৈশ্বিক চুক্তিতে অবশ্যই মানবস্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়টি থাকতে হবে।

শেষ কথা
আমরা প্রতিদিন যেসব প্লাস্টিক মোড়কের পেছনে না ভেবে ব্যাগে ভরে বাড়ি ফিরি, তা হয়তো অনেক দূরের পাহাড়ের ঢালে পড়ে থেকে যাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী। কিন্তু তার চেয়েও ভয়াবহ হলো, সেই প্লাস্টিকই ফিরছে আমাদের রক্তে, শিশুর খাদ্যে, আমাদের জীবনের প্রতিটি কোষে।

একটা সময় হয়তো আমরা সবাই বুঝতে পারব—প্লাস্টিক শুধু একটি পদার্থ নয়, এটি ভবিষ্যতের সংকেত।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

নওগাঁয় ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে ব্যাংক কর্মচারীর মৃত্যু

সপ্তাহজুড়ে কেমন থাকবে দেশের আবহাওয়া? জানাল অধিদপ্তর

স্তনবৃন্তে স্পর্শ করলেই কেন হঠাৎ মন খারাপ, কী এই ‘স্যাড নিপল সিনড্রোম’?

upay Rewards Three Distributor Partners with Umrah Packages under ‘Shopner Umrah 2026’ Campaign

উপায়ের ‘স্বপ্নের ওমরাহ’ ক্যাম্পেইনে পুরস্কার পেলেন ৩ ডিস্ট্রিবিউশন পার্টনার

সাতক্ষীরায় ৭৫ শতাংশ জলবায়ু বাস্তুচ্যুত পরিবার তীব্র খাদ্য সংকটে

মিরপুর বেড়িবাঁধে বাস-অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত ৪

হাসপাতাল নেই ৬০ গ্রামে, অসুস্থ হলে আট ঘণ্টার নদীপথ পাড়ি

চাঁদপুরে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহারে ৬ যানবাহনকে জরিমানা

ঢাকায় শুষ্ক আবহাওয়া, কমতে পারে দিনের তাপমাত্রা

বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু রক্ষায় ১২ সংস্থার সঙ্গে ইউএনডিপির চুক্তি

সড়ক দুর্ঘটনার আচরণগত ঝুঁকি নিরসনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাথে মতবিনিময় সভা