ঢাকারবিবার , ২৮ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ

পাখিরা কীভাবে পথ চেনে? সমাধান দিল নতুন গবেষণা

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
২৮ জুন ২০২৬, ১:১১ বিকাল

Link Copied!

হাসান মাহমুদ: হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে পরিযায়ী পাখিরা কীভাবে নির্ভুলভাবে তাদের নির্দিষ্ট শীতকালীন আবাসস্থলে ফিরে আসে, তা শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানীদের কাছে এক গভীর বিস্ময়ের নাম ছিল। সম্প্রতি নেদারল্যান্ডসের গ্রোনিঙেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এই রহস্যের সমাধান নিয়ে এসেছে, যা আধুনিক জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গত ২৫ জুন বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত ‘ইনেট ফ্যাক্টরস অ্যান্ড অনটোজেনি ডিটারমাইন নন-ব্রিডিং এরিয়াস অফ মাইগ্র্যান্ট সং-বার্ডস’ শিরোনামের এই গবেষণা নিবন্ধটি বিশ্বজুড়ে প্রকৃতিপ্রেমী ও বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

গবেষণার প্রেক্ষাপট ও বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য:
গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন গ্রোনিঙেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট গবেষক কোসজে ল্যামারস এবং জানে ওউহেনহ্যান্ড। পুরো প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে ছিলেন প্রখ্যাত পরিবেশ বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান বোথ। গবেষণায় ব্যবহৃত হয়েছে ‘পাইড ফ্লাইক্যাচার’ নামক এক প্রজাতির ছোট পাখি, যা মাত্র ১২ গ্রাম ওজনের হয়েও প্রতি বছর ৩ হাজার থেকে ১৩ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সক্ষম। গবেষকদের মূল লক্ষ্য ছিল—পরিযায়ী পাখির শীতকালীন গন্তব্য কি জন্মগত ডিএনএ-র মাধ্যমে নির্ধারিত, নাকি তারা বড় হওয়ার সময় পরিবেশ থেকে তা শিখে নেয়?

অভাবনীয় ‘ডিম স্থানান্তর’ পরীক্ষা:
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ইউরোপের অন্তত ৮টি ভিন্ন দেশ থেকে পাখিদের পরিযান পথ ট্র্যাকিং করা হয়েছে। ট্র্যাকিংয়ে দেখা যায়, এই পাখিরা প্রজনন শেষে ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রওনা দিয়ে প্রথমে স্পেন ও পর্তুগালে জড়ো হয় এবং সেখান থেকে আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর দিয়ে ৪০ ঘণ্টার এক টানা উড্ডয়ন শেষে আফ্রিকার নির্দিষ্ট পশ্চিম উপকূলে পৌঁছায়।

গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ ছিল ‘ডিম স্থানান্তর’ প্রক্রিয়া। গবেষকরা নেদারল্যান্ডসের ডাচ ফ্লাইক্যাচারের ডিমগুলো সরিয়ে সুইডেনের পালক পিতামাতার বাসায় রেখে দেন। এর উদ্দেশ্য ছিল—পাখিটি যদি তার নিজ জন্মস্থানের পরিবেশ থেকে দূরে বেড়ে ওঠে, তবে তার গন্তব্য ঠিক করবে কে? জিন (বংশগতি) না কি পালক পিতামাতার শেখানো পথ?

পরীক্ষার ফলাফলে উঠে আসে অভাবনীয় তথ্য। সুইডেনে বেড়ে ওঠা ডাচ ফ্লাইক্যাচারগুলো এমন এক জায়গায় গিয়ে শীতকাল কাটাচ্ছে যা তাদের স্বাভাবিক ডাচ গন্তব্য এবং সুইডিশ পাখিদের গন্তব্যের ঠিক মাঝামাঝি। এই তথ্য প্রমাণ করে, শীতকালীন আবাসস্থল নির্ধারণে কেবল ডিএনএ এককভাবে কাজ করে না, বরং বংশগতি এবং জন্মস্থানের পরিবেশ—উভয়ের একটি সূক্ষ্ম সমন্বয় কাজ করে।

বিবর্তনের এক দীর্ঘ পথচলা:
গবেষণায় আরও একটি কৌতুহলদ্দীপক তথ্য পাওয়া গেছে। সাইবেরিয়ার ফ্লাইক্যাচাররা কেন ইউরোপের ওপর দিয়ে এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়? অথচ তাদের জন্য ভূমধ্যসাগর হয়ে অনেক ছোট পথ ছিল। গবেষক কোসজে ল্যামারস ব্যাখ্যা করে বলেন, এটি সম্ভবত বিবর্তনের এক স্মৃতি। বরফ যুগের সময় হয়তো এই পাখিদের পরিযান পথ সীমাবদ্ধ ছিল, যা এখনো তাদের ডিএনএ-তে সংকেত হিসেবে রয়ে গেছে। তারা কোনো নতুন পথ শিখছে না, বরং তাদের সহজাত প্রবৃত্তি বা ‘ইনেট পাথ’ অনুসরণ করছে।

জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে পাখি ও আবাসস্থল:
এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে পাখির প্রজনন ও শীতকালীন আবাসস্থল দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, যা পরিযায়ী পাখিদের হাজার বছরের পুরনো ‘জিনগত মানচিত্র’ বা সহজাত পরিযান পথের সাথে চরম সংঘাত তৈরি করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পাখিরা মূলত বংশগতি এবং জন্মস্থানের পরিবেশগত সংকেতের সমন্বয়ে তাদের গন্তব্য নির্ধারণ করে, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাদের প্রজনন এলাকা ও শীতকালীন গন্তব্যের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তারা দিশেহারা হয়ে পড়ছে।

দ্রুত বাড়তে থাকা তাপমাত্রা, সময়ের আগেই ঋতু পরিবর্তন এবং খাদ্য উৎসের অভাব পাখিদের পরিযান সময়ের সাথে বর্তমান পরিবেশের অসামঞ্জস্য ঘটাচ্ছে; ফলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তারা যখন গন্তব্যে পৌঁছায়, তখন সেখানে খাদ্য বা আশ্রয়ের বদলে প্রতিকূল পরিস্থিতি দেখে তাদের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই ‘পরিবেশগত অমিল’ পাখিদের অভিযোজন ক্ষমতাকে ধীর করে দিচ্ছে, যার ফলে তারা তাদের প্রাচীন সহজাত পথ বা ‘ইনেট পাথ’ অনুসরণ করলেও প্রকৃত গন্তব্য হারিয়ে ফেলে বিলুপ্তির ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে গুরুত্ব:
বাংলাদেশের হাওর ও জলাভূমিগুলোতে প্রতি বছর হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি আসে। যদিও এই গবেষণাটি ইউরোপের প্রজাতি নিয়ে, তবে এর প্রভাব বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও পাখিদের এই সহজাত প্রবৃত্তি ও পরিবেশগত অভিযোজন একইভাবে কার্যকর। আমাদের দেশের জলাভূমিগুলো যদি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শুকিয়ে যায় বা তাপমাত্রা বেড়ে যায়, তবে পাখিরা যে তাদের হাজার বছরের পুরনো রুট ও গন্তব্য খুঁজে পাবে না—তা এই গবেষণা স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিচ্ছে। এটি কেবল পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, বরং জীববৈচিত্র্যের এক বড় ক্ষতি।

গবেষক ক্রিশ্চিয়ান বোথ সতর্ক করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের এই অস্থির সময়ে পাখিদের এই বংশগতি ও পরিবেশের মিথস্ক্রিয়া তাদের অভিযোজন ক্ষমতাকে ধীর করে দিতে পারে। যদি পরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হয়, তবে প্রজনন ও শীতকালীন আবাসস্থলের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখা পাখিদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রতিটি দেশের উচিত পরিযায়ী পাখিদের এই গন্তব্যগুলোকে ‘বাস্তুসংস্থানগত করিডোর’ হিসেবে রক্ষা করা।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

চীনে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ৭ বাংলাদেশি

চকরিয়ায় মাইক্রোবাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত ২

অতিরিক্ত করলা খেলে হতে পারে ৫ স্বাস্থ্যঝুঁকি

Revolutionary Technology ‘TESOS’ in Biological Tissue Observation

জৈবিক টিস্যু পর্যবেক্ষণে বৈপ্লবিক প্রযুক্তি ‘টিইএসওএস’

পাখিরা কীভাবে পথ চেনে? সমাধান দিল নতুন গবেষণা

দেশজুড়ে বাড়ছে বৃষ্টির প্রবণতা, কয়েক জেলায় তাপপ্রবাহ অব্যাহত

Phoenix Summit 2026 Concludes with Strong Focus on Cybersecurity and Digital Resilience

সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সহনশীলতায় গুরুত্ব দিয়ে শেষ হলো ফিনিক্স সামিট ২০২৬

পিকআপ-সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে মা-মেয়েসহ নিহত ৩

গ্যাস বেলুনে ১৫ মিনিট বন্ধ মেট্রোরেল

ঢাকাসহ ১২ জেলায় দুপুরের মধ্যে ঝড়-বৃষ্টির আভাস