
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের মুন্সিবাজার ও কাউয়াজানি এলাকায় ফের ভয়াবহ নদীভাঙন শুরু হয়েছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে পদ্মা গিলে খেয়েছে প্রায় ৩ কিলোমিটারজুড়ে ফসলি জমি। ভাঙনের মুখে পড়েছে বহু ঘরবাড়ি, কবরস্থান ও ঈদগাহ মাঠ। আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে নদীপাড়ের কয়েকশ পরিবারে।
জমি হারিয়ে ভূমিহীন অসংখ্য কৃষক
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোতে চোখের সামনে ভেঙে পড়ছে ফসলি জমি ও বসতভিটা। স্থানীয় বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম মোল্লা (৫৮) জানান, মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে তার ১০ বিঘা পাট ও ধানের জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “আগে যেখানে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছিল, সেখানে ভাঙন থেমে থাকলেও এখন পাশের অংশে আবারও ভাঙন শুরু হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পুরো এলাকা নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে।”
খবির সরদার (৬০) নামে আরেক কৃষক জানান, “আগে ৫ বিঘা জমি ছিল। আগের ভাঙনে তা কমে সোয়া বিঘা হয়েছিল। কিন্তু রোববার ও সোমবারের ভাঙনে সেটাও হারিয়ে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে নদী পাড়ে একটি ছাপড়াঘরে মানবেতর জীবন যাপন করছি।”
লোকমান সরদার (৫৫) বলেন, “বিগত কয়েক বছরে আমার ১০ বিঘার মধ্যে ৮ বিঘা নদীতে চলে গেছে। গত ২-৩ দিনে বাকি জমিটুকুও গেছে। এখন আমি নিঃস্ব।” তিনি দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর দাবি জানান।
“সব হারানোর পথে…”
নদীর পাড়ে বাস করা মোবারক খাঁ বলেন, “এই বাড়িটুকুও যদি নদীতে চলে যায়, তাহলে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে কোথায় যাবো? সারারাত ঘুমাতে পারি না, ভয় হয়। কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো?”
স্থানীয়দের আহ্বান
স্থানীয় সমাজসেবক মো. জামাল মুন্সী বলেন, “আর কতবার ভাঙনের শিকার হবো আমরা? আমার জমিও ঝুঁকিতে রয়েছে। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা প্রশাসনকে জানিয়েছি। অনুরোধ করছি, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, “আমরা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. নাহিদুর রহমান বলেন, “ভাঙনের খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। আশা করছি দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
পদ্মার ভাঙন যেন প্রতি বছরই নতুন করে দুর্যোগ বয়ে আনে। জীবিকা হারানো মানুষের আর্তনাদ, নিরাপত্তাহীনতা আর প্রশাসনিক আশ্বাসের মধ্যেই নদীপাড়ের মানুষ বেঁচে থাকার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে রাজবাড়ীর দেবগ্রামের আরও বহু পরিবার এই ভয়াল নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।