
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ ও অমাবস্যাজনিত অস্বাভাবিক জোয়ারের প্রভাবে কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে সৃষ্টি হয়েছে বিপর্যস্ত পরিস্থিতি। বিশ্বের দীর্ঘতম এই সৈকতে প্রবল ঢেউয়ের আঘাতে ভেঙে পড়েছে বালিয়াড়ি, উপড়ে গেছে হাজারো ঝাউগাছ, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও স্থাপনা।
শনিবার (২৬ জুলাই) দুপুরে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের লাবণী, কলাতলী, শৈবালসহ একাধিক পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, সৈকতের একাংশ ইতোমধ্যে সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। ঢেউয়ের তোড়ে সৈকতের একটি ওয়াচ টাওয়ার ভেঙে পড়েছে সাগরগর্ভে, ভাঙনের মুখে রয়েছে একটি রেস্তোরাঁও। শৈবাল পয়েন্টে বৈদ্যুতিক খুঁটির ওপর ঝাউগাছ পড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল আশপাশের এলাকা।
বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, কক্সবাজার সদর রেঞ্জের নাজিরারটেক থেকে হিমছড়ি পর্যন্ত ১৯৬১ সাল থেকে প্রায় ৩০০ হেক্টর এলাকাজুড়ে সৃজিত হয়েছিল সাড়ে সাত লক্ষাধিক ঝাউগাছ। এগুলো কেবল সৈকতের সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, উপকূলীয় অঞ্চলে ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে সুরক্ষা দিচ্ছিল। তবে সাম্প্রতিক দুর্যোগে একপ্রকার লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে এসব ঝাউবাগান। সৈকতের নিচ থেকে বালি সরে যাওয়ায় গাছের গোড়া উন্মুক্ত হয়ে পড়ে, ফলে ভেঙে পড়ছে একের পর এক গাছ।
স্থানীয়রা জানান, এভাবে ভাঙন অব্যাহত থাকলে সৈকতের পাশে অবস্থিত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম, ট্যুরিস্ট পুলিশের কার্যালয়, জেলা প্রশাসনের তথ্যকেন্দ্রসহ একাধিক স্থাপনা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. নূরুল ইসলাম জানান, এখন পর্যন্ত ৪৮৫ হেক্টর জমিতে ঝাউগাছ রোপণ করা হয়েছে। তবে সাগরপাড়ে আধুনিক বাঁধ না থাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই গাছ ও আশপাশের স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, “যদি পানি উন্নয়ন বোর্ড আধুনিক পদ্ধতিতে সাগরপাড়ে বাঁধ নির্মাণ করত, তাহলে এই ভাঙন ঠেকানো যেত।”
পানি উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম জানান, প্রতিবছর জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করা হলেও তা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে বড় পরিসরে টেকসই প্রকল্প প্রয়োজন।
আবহাওয়া অফিস জানায়, গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের ওপর সক্রিয় নিম্নচাপটি এখনও বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করছে। এর ফলে উত্তর বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের তারতম্যের কারণে দমকা ও ঝড়ো হাওয়া বইছে। ফলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
এছাড়া উপকূলীয় জেলা ও চরাঞ্চলে ১-৩ ফুট উচ্চতার বায়ুতাড়িত জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে আবহাওয়া অধিদফতর। বিশেষ করে সাতক্ষীরা, খুলনা, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ অন্তত ১৫ জেলায় জলোচ্ছ্বাসে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মাছ ধরার সব নৌকা ও ট্রলারকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি উপকূলীয় বাসিন্দা, কৃষক ও মৎস্যজীবীদের ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ক্ষয়ক্ষতি রোধে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো।