
বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরসংলগ্ন টেকনাফ-উখিয়া সীমান্ত অঞ্চলের মানুষ প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকছেন নানা ঝুঁকি, শঙ্কা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। সীমান্তে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে জীবনধারণই যেন কঠিন হয়ে উঠেছে স্থানীয়দের জন্য। বিশেষ করে সবচেয়ে বেশি ভুগছে ৫ হাজারেরও বেশি জেলে পরিবার, যাদের একমাত্র জীবিকা ছিল নাফ নদীতে মাছ ধরা।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা ঢলের সময় নিরাপত্তার স্বার্থে নাফ নদীতে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করে সরকার। আট বছর পেরিয়ে গেলেও সেই নিষেধাজ্ঞা এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি। ফলে আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে পড়েছে জেলেদের।
৭০ বছর বয়সী জেলে সমপ্তি দাস জানান, ‘‘আগে এই পল্লি ছিল কর্মচাঞ্চল্যে ভরপুর। নাফ নদীর মাছ ও শুঁটকি বিক্রি করে চলত সবার সংসার। এখন জাল বোনার কাজও বন্ধ হয়ে গেছে।’’
অসুস্থ জেলে নবী হোসেনের স্ত্রী মোস্তফা খাতুন কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘‘ওষুধ কেনারও টাকা নেই। না পারছি মাছ ধরতে, না পারছি অন্য কিছু করতে।’’
জালিয়াপাড়া ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুল গনি জানান, ‘‘মাছ ধরা বন্ধ থাকায় শত শত নৌযান ও জাল বিনা ব্যবহারে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কোটি টাকার বিনিয়োগ যাচ্ছে ভেস্তে।’’
হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আলী আহমদ বলেন, ‘‘নিরাপত্তার নামে জেলেদের নদীতে নামতে দেওয়া হচ্ছে না, অথচ সীমান্ত অপরাধ বন্ধ হয়নি। বরং মাদক ও মানবপাচার বেড়েছে। জেলে পরিবারগুলো এখন সহায়তা আর ধারদেনার ওপর নির্ভরশীল। সরকার যদি এখনই পদক্ষেপ না নেয়, বহু পরিবার না খেয়ে মরবে।’’
এ পরিস্থিতিতে কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ‘‘নিরাপত্তাজনিত জটিলতায় সীমান্তবাসীর জীবন যদি দুর্বিষহ হয়ে ওঠে, তাহলে তাদের বিকল্প পুনর্বাসন ও আয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।’’
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ এহসান উদ্দিন জানান, ‘‘গত ৫ আগস্ট থেকে মানবিক বিবেচনায় নাফ নদীর শাহপরীর দ্বীপ অংশে দিনে সীমিতভাবে মাছ ধরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো পুরো নাফ নদীতে নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে।’’
নাফ নদীতে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকায় সীমান্ত অঞ্চলের জেলেপল্লিতে এখন চলছে চরম মানবিক সংকট। পুনরায় মাছ ধরার সুযোগ ও বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা না হলে এই মানুষগুলোর জীবনযাপন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে, আশঙ্কা স্থানীয়দের।