
সূর্যের ভেতরে একের পর এক শক্তিশালী বিস্ফোরণ বিজ্ঞানীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সূর্যের একটি বিশাল ও অতিসক্রিয় কালো দাগ (সানস্পট) AR4087 থেকে নির্গত এক্স-শ্রেণির সৌরশিখা পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে। এই ভয়াবহ সৌরঝড় পৃথিবীর প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামোয় মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত ১৩ মে সকাল ১১টা ৩৮ মিনিটে সূর্য থেকে নির্গত হয় এক্স-১.২ মাত্রার সৌরশিখা। পরদিন একই স্থান থেকে আরও শক্তিশালী এক্স-২.৭ মাত্রার সৌরশিখা পৃথিবীর দিকে ছুটে আসে। এর প্রভাবে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু অঞ্চলে রেডিও সংকেত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে সৌরঝড়
এই ধরনের সৌরঝড়কে বলা হয় ‘করোনাল মাস নির্গমন’ (Coronal Mass Ejection – CME)। এটি পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রে আঘাত হানলে ঘটতে পারে নজিরবিহীন বিপর্যয়। সম্ভাব্য ক্ষতির মধ্যে রয়েছে:
১. কৃত্রিম উপগ্রহ বিকল হয়ে যাওয়া বা স্থায়ীভাবে নষ্ট হওয়া
২. বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বিপর্যয়, বিশেষ করে ট্রান্সফরমার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা
৩. মোবাইল ও ইন্টারনেট যোগাযোগে বড় ধরনের বিঘ্ন
৪. ট্রেন, মেট্রো ও বিমান চলাচলে সমস্যা
৫. জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত ও বাজারে মূল্যবৃদ্ধি
৬. ডিজিটাল অর্থনৈতিক লেনদেন ও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিপর্যয়
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান বিশ্বের জন্য এ ধরনের সৌরঝড় হতে পারে এক ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ। বাস্তবিক অর্থেই বিশ্বজুড়ে জরুরি যোগাযোগ ও সেবায় ভাঙন ধরতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতি মহড়া
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ৮ মে ২০২৪ তারিখে কলোরাডোতে একটি বড় পরিসরের মহড়া আয়োজন করে, যার নাম ছিল ‘মহাকাশ আবহাওয়া প্রস্তুতি মহড়া’ (Space Weather Tabletop Exercise)।
১. এই মহড়ায় অংশ নেয়:
২. যুক্তরাষ্ট্রের বিমান রক্ষী বাহিনী
৩. ১৪০তম উইং ও ২৩৩তম মহাকাশ দল
৪. জাতীয় সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডল সংস্থা (NOAA)
৫. স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ (Department of Homeland Security)
মহড়ার কল্পিত চিত্র অনুযায়ী, ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে একটি ভয়াবহ সৌরঝড় যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, ইন্টারনেট, ব্যাংকিং এবং জরুরি সেবাকে ধ্বংস করে দেয়। এর মোকাবেলায় কীভাবে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সেটিই ছিল মহড়ার মূল উদ্দেশ্য।
জরুরি প্রস্তুতির আহ্বান
বিজ্ঞানীরা বলছেন, সৌরঝড়ের মতো মহাজাগতিক দুর্যোগকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। সময় থাকতে সচেতনতা, পূর্বপ্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয় গড়ে না তুললে বিপর্যয়ের মাত্রা আরও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, প্রতিটি দেশকে নিজস্ব অবকাঠামো ঝুঁকি নিরূপণ করে পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি জনসাধারণের মধ্যেও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের সময় দ্রুত ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া দেওয়া সম্ভব হয়।