ঢাকাসোমবার , ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
  • অন্যান্য

আজকের সর্বশেষ সবখবর

তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ২০২৫

তামাকজনিত রোগ কমাতে অধ্যাদেশ কার্যকর, আইন রূপান্তরই মূল চ্যালেঞ্জ

নিজস্ব প্রতিবেদক
জানুয়ারি ২৬, ২০২৬ ২:০৮ অপরাহ্ণ । ২০৫ জন

বাংলাদেশে তামাকজনিত রোগ ও অকালমৃত্যু কমাতে সরকার জারি করেছে তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ২০২৫। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অধ্যাদেশটি ধূমপান ও তামাকপণ্যের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আগের তুলনায় আরও কঠোর ও সময়োপযোগী বিধান এনেছে। তবে এটিকে সংসদে আইন হিসেবে পাস করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আইন আকারে রূপান্তর না হলে অধ্যাদেশটি কার্যকারিতা হারাতে পারে।

রাজধানীতে সোমবার (২৬ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে অধ্যাদেশের মূল বিধান, জনস্বাস্থ্যে সম্ভাব্য প্রভাব এবং আইন আকারে রূপান্তরের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা নিয়ে আলোচনা হয়। সেমিনারের উদ্বোধনী বক্তব্য দেন উবিনীগের পরিচালক সীমা দাস সীমু। এরপর প্রোজেক্ট কো-অর্ডিনেটর হাসানুল হাসিব আল গালিব অধ্যাদেশের প্রধান বিষয়গুলো তুলে ধরেন।

সেমিনারে আলোচক হিসেবে অংশ নেন রাশেদা কে. চৌধুরী (বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাবেক সরকারের উপদেষ্টা), শেখ মোমেনা মনি (অতিরিক্ত সচিব, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ) এবং ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দীন (অতিরিক্ত সচিব, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ)। বিশেষ অতিথি ছিলেন মো. আখতারুজ্জামান (মহাপরিচালক, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল-এনটিটিসিসি) ও মোস্তাফিজুর রহমান (সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন)।

প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার, উপদেষ্টা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। সভাপ্রধান হিসেবে বক্তব্য ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ড. এম. এ. সোবহান, সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট।

বাংলাদেশে তামাক ব্যবহার: স্বাস্থ্যঝুঁকি ও উদ্বেগজনক চিত্র

আলোচনায় জানানো হয়, দেশে তামাক ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে উচ্চ (৩৫.৩%)- যা হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সারসহ নানা প্রাণঘাতী অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে তামাক ব্যবহারকারীর বড় একটি অংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে বসবাস করে এবং তামাকজনিত রোগে ব্যবহারকারীদের বড় অংশ অকালেই মারা যায়।

সেমিনারে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২ লক্ষ মানুষ তামাকজনিত রোগে অকাল মৃত্যুবরণ করেন- যা মোট মৃত্যুর একটি বড় অংশ। পাশাপাশি লক্ষাধিক মানুষ দীর্ঘদিন ধরে তামাকজনিত অসুস্থতায় ভুগছেন বলে আলোচনা হয়।

শিশুদের পরোক্ষ ধূমপানের ঝুঁকির দিকটিও তুলে ধরা হয়। বলা হয়, ১৫ বছরের নিচের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু পরোক্ষ ধূমপানের কারণে শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি, শ্বাসনালীজনিত সংক্রমণসহ বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে। ঢাকা শহরের কিছু বিদ্যালয়ভিত্তিক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের শরীরে নিকোটিনের উপস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলেও আলোচনা হয়- যা ঘর-বাইরের ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকার ঝুঁকি নির্দেশ করে।

এছাড়া তামাকের সঙ্গে মাদকাসক্তির সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন বক্তারা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মাদকাসক্তির দিকে ধাবিত অনেকের ক্ষেত্রেই সিগারেট বা বিড়ি ব্যবহারের মাধ্যমে অভ্যাসের শুরু- যা পরবর্তীতে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ বাড়াতে পারে।

অর্থনীতি বনাম জনস্বাস্থ্য: রাজস্ব আয়ের আড়ালে বড় ক্ষতি

সেমিনারে বক্তারা বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার তামাক খাত থেকে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছে। তবে একই সময় তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা ব্যয়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং পরিবেশগত ক্ষতি মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা- যা রাজস্ব আয়ের তুলনায় অনেক বেশি।

বক্তাদের মতে, ‘রাজস্ব আয়ের যুক্তিতে তামাক নিয়ন্ত্রণ শিথিল হলে তা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় ও সামাজিক ক্ষতি আরও বাড়াবে।’

অধ্যাদেশ ২০২৫: কী কী কঠোর বিধান যুক্ত হয়েছে

তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ২০২৫-এ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ও নতুন বিধান রাখা হয়েছে। সেমিনারে উপস্থাপিত মূল বিষয়গুলো হলো-

১. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, খেলার মাঠ ও শিশু পার্কের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকপণ্য বিক্রি নিষিদ্ধ।

২. সব পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে; পাশাপাশি স্মোকিং জোন ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে।

৩. তামাকপণ্যের সব ধরনের বিজ্ঞাপন এবং দোকানে পণ্যের পয়েন্ট-অফ-সেল প্রদর্শন নিষিদ্ধ।

৪. ই-সিগারেট, ভ্যাপ, ENDS, HIPসহ নতুন ধরনের তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, রপ্তানি, সংরক্ষণ, বিপণন, বিতরণ ও ব্যবহার নিষিদ্ধ।

৫. তামাকপণ্যের প্যাকেটে স্বাস্থ্য সতর্কবার্তার আকার ৭৫% করা হয়েছে।

৬. আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে জরিমানা বাড়ানো হয়েছে। পাবলিক প্লেসে ধূমপানের জরিমানা ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর

আলোচকদের মতে, অধ্যাদেশ জারি হওয়া মানেই স্থায়ী সমাধান নয়। অধ্যাদেশ স্থায়ী নয়, তাই এটিকে সংসদে পাস করে আইন হিসেবে রূপান্তর না করলে পরবর্তীতে এর কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। সেমিনারে উল্লেখ করে বলা হয়, নির্বাচিত সরকারের প্রথম সংসদ অধিবেশনের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে অধ্যাদেশটি আইন আকারে রূপান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা প্রয়োজন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম ঘেব্রেয়েসুস- এর বক্তব্য উল্লেখ করে আলোচকরা বলেন, জনস্বাস্থ্য রক্ষায় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে টেকসই করতে আইনগত ভিত্তি অপরিহার্য।

নাগরিক সমাজের ভূমিকা ও তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ ঠেকানো

উবিনীগ ও তাবিনাজের পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়- অধ্যাদেশকে আইন বানাতে সরকার, সুশীল সমাজ, তরুণ সমাজ ও গণমাধ্যম একসঙ্গে কাজ করলে জনমত তৈরি হবে এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় তামাক কোম্পানির প্রভাব ও হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ সম্ভব হবে।

সেমিনারের সিদ্ধান্তসমূহ

সেমিনারের আলোচনার ভিত্তিতে কয়েকটি মূল সিদ্ধান্ত উঠে আসে-

১. তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ২০২৫ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

২. অধ্যাদেশকে স্থায়ী করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে।

৩. জনমত সৃষ্টি এবং তামাক শিল্পের প্রভাব প্রতিরোধে সুশীল সমাজ, তরুণসমাজ ও গণমাধ্যমের সমন্বিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।