
টাইফুন ডলফিনের প্রভাবে চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বৃষ্টি, বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ঝড়টি দেশের আরও গভীরে প্রবেশ করায় রাজধানী বেইজিংয়ে মঙ্গলবার রাত থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ১৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই পরিমাণ বৃষ্টি বেইজিংয়ের গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাতের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি।
বেইজিংয়ের আবহাওয়া পরিষেবা জানিয়েছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শহরের বেশিরভাগ এলাকায় ভারী বর্ষণ হতে পারে। শহরটির গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত প্রায় ৫২৮ মিলিমিটার, যার বেশিরভাগই জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে হয়ে থাকে।
ঝড়ের প্রভাবে বন্যার আশঙ্কায় বেইজিংয়ের উপকণ্ঠের চারটি জেলায় সর্বোচ্চ পর্যায়ের জরুরি বন্যা মোকাবিলা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। পশ্চিম বেইজিংয়ের পার্বত্য জেলা মেনতৌগৌতে সর্বোচ্চ স্তরের বন্যা জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। প্রয়োজন ছাড়া মানুষকে ঘরের বাইরে না যাওয়ার পাশাপাশি পাহাড়ি এলাকা ও নদীতে ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পূর্ব চীনে ১০ লাখের বেশি মানুষ সরানো
টাইফুন ডলফিনের প্রভাবে সপ্তাহান্তে পূর্ব চীনজুড়ে ১০ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ঝড়ের সঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টি হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ঝেজিয়াং প্রদেশের উপকূলীয় শহর ওয়েনঝৌতে ৯ লাখের বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাদের জন্য ১ হাজার ৫০০টির বেশি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। পার্শ্ববর্তী ফুজিয়ান প্রদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে আরও ৯৮ হাজার ৯০০ মানুষ।
সাংহাইয়েও ঝড়ের প্রভাব পড়েছে। সোমবার ভারী বৃষ্টি ও প্রবল বাতাসে শহরটির বিভিন্ন এলাকায় পরিস্থিতির অবনতি হয়। রবিবার সন্ধ্যা নাগাদ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে ২ লাখ ১৫ হাজার ৬০০ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
হুবেইয়ে ভারী বৃষ্টির কমলা সতর্কতা
মঙ্গলবার ভোরে টাইফুন ডলফিন মধ্য চীনের হুবেই প্রদেশের ওপর দিয়ে অতিক্রম করে। ৫ কোটি ৮০ লাখের বেশি মানুষের এই প্রদেশটি গাড়ি ও উচ্চপ্রযুক্তির ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
ঝড়ের প্রভাবে ভারী বৃষ্টির আশঙ্কায় চীনের জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্র দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সতর্কতা স্তর ‘কমলা সতর্কতা’ জারি করেছে। উত্তর-পশ্চিম হুবেইয়ে আগামী ২৪ ঘণ্টায় ২৫০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ায় হুবেইয়ের শিয়াংইয়াং, হুয়াংগ্যাং ও সুইঝৌসহ বিভিন্ন শহরে হলুদ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
পর্যটনকেন্দ্র ও নির্মাণকাজ বন্ধ
ঝড়ের কারণে হুবেই প্রদেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইচাংয়ের জনপ্রিয় থ্রি গর্জেস ড্যাম পর্যটন এলাকাও রয়েছে।
এ ছাড়া প্রদেশের চলমান ১০৭টি প্রধান মহাসড়ক ও জলপথ নির্মাণ প্রকল্পের মধ্যে উচ্চঝুঁকির ২৬টি প্রকল্পের কাজ স্থগিত করা হয়েছে। ঝড়ের সময় শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেশী হেনান প্রদেশেও আকস্মিক বন্যার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। টাইফুনটি উত্তর দিকে আর্দ্রতা প্রবাহিত করায় সেখানে ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
৬ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে চীনে ডলফিন
টাইফুন ডলফিনকে চলতি বছর চীনে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী টাইফুন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ঝড়টি স্থলভাগে আঘাত হানার আগে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে।
দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেও ঝড়টি শক্তি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এর সঙ্গে বিস্তৃত মেঘপুঞ্জ থাকায় চীনের পূর্ব উপকূল থেকে দেশের অভ্যন্তর পর্যন্ত ব্যাপক এলাকায় বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসের প্রভাব পড়ছে।
ঝড়ের প্রভাবে বিভিন্ন এলাকায় পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ, নির্মাণকাজ স্থগিত এবং মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কায় প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
জাপানেও দুর্যোগের আশঙ্কা
এদিকে জাপানও নতুন দুর্যোগের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। জাপান আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, টাইফুন চ্যান-হোম মঙ্গলবার দেশটির মূল ভূখণ্ড অতিক্রম করতে পারে।
এর প্রভাবে জাপানের বিভিন্ন এলাকায় ভূমিধস, বন্যা ও প্রবল বাতাসের আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে চীনের পাশাপাশি জাপানেও স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
চীনে ডলফিনের প্রভাবে একদিকে লাখ লাখ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে বেইজিংসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বৃষ্টির প্রস্তুতি চলছে। বিশেষ করে রাজধানীতে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের এক-তৃতীয়াংশের বেশি বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।