ঢাকাবৃহস্পতিবার , ৫ নভেম্বর ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. জনস্বাস্থ্য

অটিজমের সংজ্ঞা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন বিতর্ক

প্রতিবেদক
বিপ্লব হোসাইন
৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০৩ বিকাল

Link Copied!

অটিজমকে একটি বিস্তৃত বর্ণালির (অটিজম স্পেকট্রাম) মধ্যে বিবেচনা করার ধারণা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একসময় অটিজমের বিভিন্ন ধরনকে একই বর্ণালির আওতায় আনার পক্ষে থাকা কয়েকজন গবেষক এখন মনে করছেন, এর সংজ্ঞা অতিরিক্ত বিস্তৃত হয়ে পড়ছে। ফলে যাদের সহায়তার প্রয়োজন অনেক বেশি এবং যাদের তুলনামূলকভাবে কম, তাদের ভিন্ন চাহিদা যথাযথভাবে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে উঠছে।

অন্যদিকে, অটিজম অধিকারকর্মী ও কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, এই বিস্তৃত সংজ্ঞার ফলে আগে শনাক্ত না হওয়া অনেক মানুষও নিজেদের অবস্থার স্বীকৃতি পাচ্ছেন। বিশেষ করে নারী ও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অটিজম শনাক্তের সুযোগ বেড়েছে। ফলে অটিজমের সংজ্ঞা সংকুচিত করার পরিবর্তে প্রত্যেকের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা নিশ্চিত করাই বেশি জরুরি।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের ১ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অটিজমের সংজ্ঞা, রোগনির্ণয় এবং সহায়তা পাওয়ার অধিকার নিয়ে বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এই মতপার্থক্যের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

অটিজমের একক বর্ণালি নিয়ে প্রশ্ন

অটিজম স্পেকট্রাম ধারণার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ব্রিটিশ মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক উটা ফ্রিথ এখন মনে করছেন, অটিজমের বর্ণালি অনেক বেশি বিস্তৃত হয়ে গেছে। তার আশঙ্কা, বিশেষ করে যেসব প্রাপ্তবয়স্কের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা বা ভাষাগত বিকাশে উল্লেখযোগ্য সমস্যা নেই, তাদের মধ্যে অটিজম নির্ণয়ের পরিধি বাড়তে থাকায় চিকিৎসাগত রোগনির্ণয়ের ধারণাটি অস্পষ্ট হয়ে পড়তে পারে।

তার মতে, অটিজমের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও সমস্যাকে একসঙ্গে বিবেচনা করার ফলে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যেখানে ভিন্ন ধরনের প্রয়োজন থাকা মানুষ একই পরিচয়ের আওতায় চলে আসছেন। এতে যাদের নিবিড় সহায়তা প্রয়োজন, তাদের চাহিদা যথাযথভাবে গুরুত্ব না পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অটিজমের সংজ্ঞা পরিবর্তনের ইতিহাসও এ বিতর্কের সঙ্গে জড়িত। ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন তাদের মানসিক রোগ নির্ণয়বিষয়ক নির্দেশিকা ডিএসএম-৫ (DSM-5) প্রকাশ করে। এতে আগে পৃথকভাবে ব্যবহৃত অ্যাসপারজার সিনড্রোম, অটিস্টিক ডিসঅর্ডারসহ কয়েকটি রোগনির্ণয়কে একত্র করে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD) শ্রেণির আওতায় আনা হয়।

এর ফলে অটিজমের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে একটি বিস্তৃত কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করা শুরু হয়। ব্যক্তির বুদ্ধিবৃত্তিক ও ভাষাগত সক্ষমতা এবং কতটা সহায়তা প্রয়োজন, সেগুলোও রোগনির্ণয়ের ক্ষেত্রে বিবেচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

আবার পৃথক শ্রেণি তৈরির প্রস্তাব

অটিজম গবেষক ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইমন ব্যারন-কোহেন মনে করেন, অটিজমের বর্তমান একক পরিচয় অনেক বেশি বিস্তৃত হয়ে গেছে। তার প্রস্তাব, অটিজমের মধ্যে পৃথক উপশ্রেণি বা সাবগ্রুপ তৈরি করা যেতে পারে।

তিনি উদাহরণ হিসেবে তিন ধরনের শ্রেণির কথা বলেছেন। প্রথম শ্রেণিতে থাকতে পারে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা ও ভাষাগত বিকাশে বিলম্ব থাকা ব্যক্তিরা। দ্বিতীয় শ্রেণিতে থাকতে পারেন যাদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা নেই। এভাবে আরও নির্দিষ্ট উপশ্রেণি তৈরি করা হলে ব্যক্তির প্রকৃত অবস্থা ও সহায়তার প্রয়োজন আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।

ব্যারন-কোহেনের মতে, অটিজমের সঙ্গে অনেকের এডিএইচডি (ADHD), ডিসলেক্সিয়া, ডিসপ্র্যাক্সিয়া, উদ্বেগ, পরিপাকজনিত সমস্যা কিংবা মৃগীরোগের মতো অন্য সমস্যাও থাকতে পারে। তাই শুধু অটিজম পরিচয়ের পরিবর্তে ব্যক্তির সামগ্রিক অবস্থা আরও নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

তবে উপশ্রেণি তৈরি করলেও কোনো শ্রেণির মানুষকে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করা যাবে না। প্রত্যেকের সমান সম্মান, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

বিস্তৃত সংজ্ঞার পক্ষেও যুক্তি

অন্যদিকে, অটিজম অধিকারকর্মী ও অটিস্টিক চিকিৎসক মেরি ডোহার্টি মনে করেন, অটিজমের বিস্তৃত সংজ্ঞা কোনো সমস্যা নয়; বরং এটি আগে উপেক্ষিত মানুষের অভিজ্ঞতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।

নিজে ৪৫ বছর বয়সে অটিজম শনাক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, আগে অটিজমকে মূলত গুরুতর প্রতিবন্ধকতা থাকা শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেখা হতো। ফলে অনেক প্রাপ্তবয়স্ক, বিশেষ করে নারী, নিজেদের অটিজম-সম্পর্কিত বৈশিষ্ট্য বুঝতে পারতেন না।

তার মতে, অটিজমের বিস্তৃত ধারণা এসব মানুষের অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজন সামনে নিয়ে এসেছে। তাই রোগনির্ণয়ের পরিধি সংকুচিত করার চেষ্টা করলে আবারও অনেক মানুষ অবহেলার শিকার হতে পারেন।

দেরিতে অটিজম শনাক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা

প্রতিবেদনে প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে অটিজম শনাক্ত হওয়া কয়েকজন নারীর অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪২ বছর বয়সে অটিজম শনাক্ত হওয়া হিনা শেখ এবং ২৮ বছর বয়সে শনাক্ত হওয়া অ্যাবিগেইল স্টোর ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

হিনা শেখ জানান, সামাজিক যোগাযোগ, চোখে চোখ রেখে কথা বলা এবং দৈনন্দিন আচরণের কিছু বিষয় নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন সমস্যায় ছিলেন। কিন্তু আগে নিজের অভিজ্ঞতাগুলোকে অটিজমের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারেননি। পরে একজন সমাজকর্মীর পর্যবেক্ষণ ও নিজের অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিষয়টি বুঝতে পারেন।

অন্যদিকে, অ্যাবিগেইল স্টো ছোটবেলা থেকেই সামাজিক পরিবেশে মানিয়ে নিতে অসুবিধা, শব্দের প্রতি অতিসংবেদনশীলতা এবং কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপের মতো সমস্যায় ভুগছিলেন। তবে এসব বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও আগে তার অটিজম শনাক্ত হয়নি। ২০২৬ সালের এপ্রিলে রোগনির্ণয়ের পর তিনি নিজের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা খুঁজে পান বলে জানান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক অটিস্টিক ব্যক্তি সামাজিক পরিবেশে অন্যদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে নিজেদের স্বাভাবিক আচরণ ও প্রতিক্রিয়া আড়াল করার চেষ্টা করেন। একে বলা হয় ‘মাস্কিং’ (Masking)। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এ প্রবণতা থাকায় তাদের অটিজম শনাক্ত হতে দেরি হতে পারে।

রোগনির্ণয়ের চেয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক ফ্রান্সেসকা হ্যাপে মনে করেন, অটিজমকে পৃথক শ্রেণিতে ভাগ করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ মানুষের বৈশিষ্ট্য, সক্ষমতা ও সহায়তার প্রয়োজন সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। একই ব্যক্তির ক্ষেত্রেও পরিস্থিতিভেদে অটিজমের বৈশিষ্ট্য ভিন্নভাবে প্রকাশ পেতে পারে।

তার মতে, শুধু রোগনির্ণয়ের পরিচয় দেওয়ার চেয়ে ব্যক্তির কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, সেটি বোঝা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আত্মপরিচয়, পরিবার ও সমাজের বোঝাপড়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মক্ষেত্র বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাও জরুরি।

প্রতিবেদনে উঠে আসা মতপার্থক্যের একটি বড় দিক হলো, অটিজমের বিস্তৃত সংজ্ঞার কারণে বেশি কথা বলতে বা নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করতে সক্ষম ব্যক্তিরা কখনো কখনো সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে পারেন। অন্যদিকে, যাদের সার্বক্ষণিক সহায়তা প্রয়োজন, তাদের চাহিদা আড়ালে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অটিজমের সংজ্ঞা ও শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও একটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে-অটিজমের ধরন বা মাত্রা যাই হোক, প্রত্যেক ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা, চিকিৎসা, শিক্ষা ও সামাজিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। অটিজমের পরিচয় নিয়ে বিতর্কের চেয়ে মানুষের বাস্তব চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়াই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

এক ধাক্কায় ৪.৭ শতাংশ কমল অপরিশোধিত তেলের দাম

ডলারের চাহিদা মেটাতে রিজার্ভ থেকে আরও ১০ কোটি ডলার বিক্রি

টানা দুই দফায় আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম, ভরি কত?

১২ দেশে যেতে আগ্রহীদের জন্য মন্ত্রণালয়ের সতর্কবার্তা

হামের টিকা সংগ্রহে বিলম্বের কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের কমিশন

সাংবাদিক হত্যায় বিশ্বজুড়ে বাড়ছে বিচারহীনতা: ৭ জনের ৬ জনেরই বিচার হয় না

নিউজিল্যান্ডে বাড়ছে বেকারত্ব, কমছে কর্মসংস্থান

মহাকাশে তৈরি হচ্ছে ক্যানসারের ওষুধের উপাদান!

দেশের ১৫ হাজার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিকল্পনা সরকারের

দুই দিন পরই আবার বাড়ল স্বর্ণের দাম

ডেঙ্গুতে আরও ৬ মৃত্যু, হামের উপসর্গেও প্রাণ গেল ৬ জনের

যশোরে ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ গেল কলেজছাত্রের