ঢাকাসোমবার , ২৯ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

২০২৫ সালের ‘বিশ্ব সুখ প্রতিবেদন’: পূর্ব এশিয়ার শীর্ষে তাইওয়ান, তলানিতে বাংলাদেশ

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
২৫ মে ২০২৫, ১১:৩৭ সকাল

Link Copied!

অতীতের গল্প শুনলে আমরা বুঝতে পারি, মানুষ চিরকালই সুখের সন্ধান করেছে। কোনো এক সময়ে হিমালয়ের গায়ে বসে এক ঋষি বলেছিলেন, “সুখ হলো অন্তরের অবস্থা, বাইরের নয়।” কিন্তু ২০২৫ সালের এই বিশ্বায়নের যুগে, সুখকে পরিমাপ করার চেষ্টায় নেমেছে গোটা বিশ্ব। কেউ বলছে, মাথাপিছু আয়ই সুখের মাপকাঠি, কেউ বলছে গণতন্ত্র, আবার কেউবা বলছে—সম্পর্ক, নিরাপত্তা ও মানসিক স্বস্তিই আসল। এ সকল চিন্তার ছায়া স্পষ্ট হয়ে উঠেছে “World Happiness Report 2025”-এ। বিশেষ করে পূর্ব এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে বৈচিত্র্যময় চিত্র। যে চিত্রে একদিকে যেমন অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড আছে সর্বোচ্চ সুখের স্কোর নিয়ে, অন্যদিকে তেমনি বাংলাদেশ রয়েছে তালিকার একেবারে নিচে।

২০২৫ সালের ‘World Happiness Report’ অনুযায়ী, পূর্ব এশিয়া ও ওশেনিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সুখী দেশ হিসেবে স্থান পেয়েছে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড। দুটি দেশেরই গড় স্কোর ৭.০। এমনকি এই দুটি দেশের দুটি শহর—অস্ট্রেলিয়ার সিডনি এবং নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড—২০২৪ সালের ‘The Economist’ ম্যাগাজিনের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। এই অর্জন শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন কিংবা অবকাঠামোর ভিত্তিতে নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তা, পরিবেশবান্ধব অবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক প্রশান্তির যৌথ ভিত্তিতে নির্ধারিত।

অপরদিকে পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে সুখী দেশ হিসেবে উঠে এসেছে তাইওয়ান। স্কোর ৬.৭। এই দেশটি ২০২২ সালের পর আবারও সেরা সুখী দেশের মুকুট ফিরে পেয়েছে। তাইওয়ানের এই অবস্থান প্রমাণ করে, রাজনৈতিক চাপ কিংবা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাব সত্ত্বেও একটি সমাজ কতটা সুখী হতে পারে, যদি সেখানে নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সমতা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়।

তবে এই অঞ্চলের বিপরীত প্রান্তে আছে বাংলাদেশ। সর্বনিম্ন স্কোর ৪.০ নিয়ে পূর্ব এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে অসুখী দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক একটি তথ্য। একদিকে যেসব দেশ গড়পড়তা ৬.০ কিংবা ৭.০ স্কোর অর্জন করছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনো ৫.০-এর নিচে রয়ে গেছে। এর কারণ খুঁজতে গেলে বোঝা যায়, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সীমাবদ্ধতা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ এখানে মানুষকে উদ্বিগ্ন করে রেখেছে।

চীনের স্কোর ৫.৯, মঙ্গোলিয়া ৫.৮, হংকং ৫.৫, জাপান ৬.১, দক্ষিণ কোরিয়া ৬.০, ফিলিপাইন ৬.১—এই সংখ্যাগুলো একটি অঞ্চলের নাগরিকদের আত্ম-অবমূল্যায়ন বা আত্মবিশ্বাসের মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। এসব দেশ হয়ত অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবন ও মানসিক প্রশান্তির সূচকে তারা এখনো ইউরোপ বা ওশেনিয়ার উন্নত দেশগুলোর ধারেকাছে নয়।

এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানা যায়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো, যেমন—থাইল্যান্ড (৬.২), মালয়েশিয়া (৬.০), ভিয়েতনাম (৬.৪), সিঙ্গাপুর (৬.৬)—একটি ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, সিঙ্গাপুর দীর্ঘদিন ধরে ‘সুখী শহর-রাষ্ট্র’ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এবার এই স্থানটি তাইওয়ান দখল করেছে। যদিও সিঙ্গাপুরের স্কোর খুব একটা কম নয়, তবু তাইওয়ান ২০২৫ সালে মানসিক স্বস্তির সূচকে কিছুটা এগিয়ে গেছে।

ভারতের স্কোর মাত্র ৪.৪ এবং নিকটবর্তী দেশ শ্রীলঙ্কা ও মায়ানমার দুটোই ৩.৯ করে স্কোর করেছে, যা এই অঞ্চলের সামাজিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক সংকট এবং নিরাপত্তাহীনতার প্রতিচ্ছবি। লাওস (৫.৩), নেপাল (৫.৩) এবং ইন্দোনেশিয়া (৫.৬) কিছুটা উন্নত স্কোর পেলেও সেটিকে সন্তোষজনক বলা যাবে না।

বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, যে সকল দেশ জনমত, গণতন্ত্র, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে, তারা তুলনামূলকভাবে বেশি সুখী। এর পাশাপাশি যে বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো—মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সমর্থন। সুখ কেবল পকেটে জমা অর্থের ওপর নির্ভর করে না, বরং আত্মমর্যাদা, নিরাপত্তা, সম্পর্ক এবং ভবিষ্যতের প্রতি আস্থাই একজন মানুষের সুখবোধে বড় ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যায়, দারিদ্র্য, রাজনৈতিক দুর্বলতা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে দুর্বল অবকাঠামো, এবং নাগরিক সেবার অপ্রতুলতাই মূলত মানুষের হতাশা ও অসুখের অন্যতম কারণ। এ ছাড়া তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কর্মসংস্থান সংকট, নারী নিরাপত্তা ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এই সূচকে পিছিয়ে পড়ার পেছনে।

এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কীভাবে এই অবস্থার পরিবর্তন আনতে পারি? প্রথমত, জনগণের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, নারী ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে ইতিবাচক মনোভাব এবং পারস্পরিক সহানুভূতি গড়ে তোলা।

সুখ নিয়ে এই গবেষণাটি আমাদের জানিয়ে দেয়—জিডিপি বড় বিষয় হতে পারে, কিন্তু সেটি একমাত্র নয়। মানুষ তখনই সুখী হয়, যখন সে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, যখন সে নিরাপদ বোধ করে, যখন তার চারপাশে ভালোবাসা, সহানুভূতি ও সামাজিক সংহতি থাকে। তাই জাতি হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে ‘সহজে বেঁচে থাকা’র পরিবেশ সৃষ্টি করায়।

২০২৫ সালের এই প্রতিবেদন একদিকে যেমন অগ্রগতির প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছে, তেমনি বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য একটি বার্তাও বয়ে এনেছে—যতদিন না নাগরিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মানসিক স্বস্তি নিশ্চিত করা যায়, ততদিন উন্নয়নের কোনো অর্থ দাঁড়ায় না। তাই আজকে সময় এসেছে উন্নয়ন সূচকের চেয়ে মানবিক সূচককে গুরুত্ব দেওয়ার। তাহলেই একদিন বাংলাদেশও এই মানচিত্রে ‘সুখী দেশের’ রঙে রঙিন হবে।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

চীনে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ৭ বাংলাদেশি

চকরিয়ায় মাইক্রোবাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত ২

অতিরিক্ত করলা খেলে হতে পারে ৫ স্বাস্থ্যঝুঁকি

Revolutionary Technology ‘TESOS’ in Biological Tissue Observation

জৈবিক টিস্যু পর্যবেক্ষণে বৈপ্লবিক প্রযুক্তি ‘টিইএসওএস’

পাখিরা কীভাবে পথ চেনে? সমাধান দিল নতুন গবেষণা

দেশজুড়ে বাড়ছে বৃষ্টির প্রবণতা, কয়েক জেলায় তাপপ্রবাহ অব্যাহত

Phoenix Summit 2026 Concludes with Strong Focus on Cybersecurity and Digital Resilience

সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সহনশীলতায় গুরুত্ব দিয়ে শেষ হলো ফিনিক্স সামিট ২০২৬

পিকআপ-সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে মা-মেয়েসহ নিহত ৩

গ্যাস বেলুনে ১৫ মিনিট বন্ধ মেট্রোরেল

ঢাকাসহ ১২ জেলায় দুপুরের মধ্যে ঝড়-বৃষ্টির আভাস