
মানবজাতির ইতিহাসে ক্রীড়াঙ্গন সবসময়ই ছিল এক বিস্ময়কর নাট্যমঞ্চ। এখানে একদিকে যেমন লড়াই, কৌশল ও শারীরিক দক্ষতার প্রকাশ ঘটে, অন্যদিকে ফুটে ওঠে মনুষ্যত্ব, সহিষ্ণুতা ও সীমা অতিক্রমের সাহসিকতা। ২০০০ সালের পর থেকে এই মঞ্চে উঠে এসেছেন এমন সব নায়ক-নায়িকারা, যাঁদের কৃতিত্ব শুধু খেলার মাঠেই নয়, বরং গোটা মানবসভ্যতার মনোজগতে ছাপ রেখেছে। সম্প্রতি, ক্রীড়াবিষয়ক সর্বাধিক প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ESPN এমনই এক তালিকা প্রকাশ করেছে—“Top 100 Athletes Since 2000”—যেখানে সর্বকালের অন্যতম সেরা ক্রীড়াবিদদের পারফরম্যান্স, অর্জন, প্রভাব ও জনপ্রিয়তাকে বিবেচনায় নিয়ে সাজানো হয়েছে এক ঐতিহাসিক সোপান।
এই তালিকার শীর্ষস্থানটি দখল করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জলদস্যু, অলিম্পিকের জলের দেবতা মাইকেল ফেলপস। তার নামের পাশে যুক্ত হয়েছে ২৩টি অলিম্পিক স্বর্ণপদক। শুধুমাত্র পদক সংখ্যাই নয়, বরং তার শরীরী কাঠামো, প্রতিযোগিতার মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষমতা এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়ার গুণই তাকে দিয়েছে ‘অ্যাথলেটিক সৌরজগতের সূর্য’ হওয়ার মর্যাদা।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন বিশ্বের টেনিস কোর্টে রাজত্ব করা এক নারী, সেরেনা উইলিয়ামস। কেবল নারীদের টেনিসই নয়, বরং পুরুষশাসিত ক্রীড়াঙ্গনে একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারী হিসেবে তার বিজয়গাথা হয়ে উঠেছে এক অনুপ্রেরণার উৎস। তার সংগ্রহে ২৩টি গ্র্যান্ড স্লাম, অসংখ্য শিরোপা ও কোটি কোটি ভক্তের ভালোবাসা। সেরেনা শুধু একটি নাম নয়, এটি এক প্রতিবাদের প্রতীক, নারীর শক্তির প্রতিচ্ছবি।
তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন একজন জাদুকর, যার পায়ের স্পর্শে বল যেন কথা বলে—লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনার এই ক্ষুদে জাদুকর বার্সেলোনা থেকে শুরু করে প্যারিস এবং অবশেষে বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দলের নেতৃস্থানীয় খেলোয়াড় হিসেবে প্রমাণ করে দিয়েছেন, শারীরিক উচ্চতা নয়, বরং দৃষ্টি, দক্ষতা ও একাগ্রতা দিয়েই জয় করা যায় পৃথিবী।
চতুর্থ স্থানে রয়েছেন এনবিএর রাজপুত্র লেব্রন জেমস। মাইকেল জর্ডানের পর যিনি এনবিএকে নতুন এক যুগে পৌঁছে দিয়েছেন, যিনি কেবল স্কোরিং বা ডান্কিংয়েই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং হয়ে উঠেছেন সমাজের একজন নেতাও।
পঞ্চম অবস্থানে রয়েছেন টম ব্র্যাডি। আমেরিকান ফুটবলের ইতিহাসে সর্বাধিক সফল কোয়ার্টারব্যাক হিসেবে যিনি ছয়টি সুপার বোল জয় করেছেন, তার পাসিং গুণ, ঠাণ্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং লম্বা সময় ধরে খেলার সামর্থ্য তাকে এনএফএলের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের কাতারে স্থান দিয়েছে।
এই তালিকার পরবর্তী কয়েকটি স্থানও ভরে গেছে কিংবদন্তিদের দ্বারা। ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছেন সুইস টেনিস রাজা রজার ফেদেরার, যিনি সৌন্দর্য, শৈলী ও শুদ্ধ টেনিসের অপর নাম। তার বিপরীতে রয়েছে সার্বিয়ান মহারথী নোভাক জকোভিচ, স্প্যানিশ বলিষ্ঠ রাফায়েল নাদাল, এবং নারীদের টেনিসে তার যোগ্য উত্তরসূরী সিমোন বাইলস।
সপ্তম স্থানে রয়েছেন সিমোন বাইলস, যিনি জিমন্যাস্টিকসে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা তুলে ধরেছেন বিশ্বমঞ্চে। তার মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এবং আত্মসম্মানকে গুরুত্ব দেওয়ার দৃষ্টান্ত গড়েছে নতুন আলোচনার সূত্রপাত।
অষ্টম স্থানে রয়েছেন টাইগার উডস। গল্ফের ইতিহাসে তার আবির্ভাব যেন এক বিপ্লব, যিনি শৈশব থেকেই অসাধারণ প্রতিভা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং প্রথাগত শ্বেতাঙ্গ-প্রভাবিত গল্ফ বিশ্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
নবম স্থানে আছেন উসেইন বোল্ট—‘দ্য ফাস্টেস্ট ম্যান অন আর্থ’। তার ৯.৫৮ সেকেন্ডের বিশ্বরেকর্ড আজও অটুট। তার প্রতিযোগিতা কেবল গতির নয়, বরং আত্মবিশ্বাস ও বিনোদনেরও।
দশম স্থানটিতে রয়েছেন এনবিএর ‘ব্ল্যাক মাম্বা’ কোবে ব্রায়ান্ট, যিনি দুঃখজনকভাবে ২০২০ সালে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। তার “মাম্বা মেন্টালিটি” আজকের তরুণ অ্যাথলেটদের জন্য হয়ে উঠেছে এক দর্শন।
এই তালিকায় আরও স্থান পেয়েছেন এমন কিছু নাম যারা নিজ নিজ খেলার মাধ্যমে কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক সাফল্যই অর্জন করেননি, বরং মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—স্টিফেন কারি, যিনি বাস্কেটবলে ৩-পয়েন্ট বিপ্লবের সূচনা করেন; কেটি লেডেকি, যিনি নারীদের সাঁতারে আধিপত্য স্থাপন করেন; এবং প্যাট্রিক মাহোমস, যিনি এনএফএলে নতুন যুগের সূচনা করেছেন।
ফর্মুলা ওয়ানে লুইস হ্যামিল্টনের আধিপত্য, রাগবির মাঠে অ্যারন ডোনাল্ডের বিপুল ভরসা, বা টিম ডানকান ও শাকিল ও’নিলের মত খেলোয়াড়দের অবদান—সব মিলিয়ে এই তালিকাটি কেবল একশ’ ক্রীড়াবিদের নাম নয়, এটি একশ’ গল্প, একশ’ সংগ্রাম, একশ’ অনুপ্রেরণার ধারা।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো বা মেসির তুলনা নিয়ে যুগ যুগ ধরে তর্ক হবে, তবে এই তালিকার উদ্দেশ্য তর্ক নয়, বরং স্বীকৃতি দেওয়া। এই তালিকা প্রমাণ করে, ২০০০ সালের পর ক্রীড়াক্ষেত্রে এমন সব মানুষ উঠে এসেছেন, যাঁরা কেবল নিজেদের দক্ষতা দিয়েই নয়, বরং নিজেদের অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মানুষের মাঝে প্রভাব রেখেছেন।
ESPN-এর এই তালিকা এক অনন্য দলিল, যা ক্রীড়ার ইতিহাসকে সংরক্ষণ করে, নতুন প্রজন্মকে দিকনির্দেশনা দেয় এবং বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের বিবর্তনের প্রতিফলন তুলে ধরে। এটি আমাদের শেখায়—কেবল খেলার ফলাফল নয়, একজন অ্যাথলেটের প্রভাব পরিমাপ করতে হয় তার সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রভাব, মানসিক দৃঢ়তা এবং মানবিক মূল্যবোধ দিয়েও।