
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে সালফারের সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। এতে সার উৎপাদনের ব্যয় বাড়ছে, বাধাগ্রস্ত হচ্ছে উৎপাদন। সংকট দীর্ঘায়িত হলে কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের।
জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনের উপজাত হিসেবে পাওয়া সালফার থেকে তৈরি হয় সালফিউরিক অ্যাসিড। তামা উত্তোলন এবং ফসফেট সার উৎপাদনে এ অ্যাসিড গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। যুদ্ধের আগে বিশ্বে সরবরাহ হওয়া সালফারের প্রায় অর্ধেকই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। এ পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সরবরাহ সংকটের কারণে সালফারের দামও দ্রুত বেড়েছে। আগে প্রতি টন সালফারের দাম ১০০ থেকে ২০০ ডলারের মধ্যে থাকলেও এখন তা প্রায় ১ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। এর সঙ্গে সালফিউরিক অ্যাসিডের বড় সরবরাহকারী দেশ চীন রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ায় বাজারের সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
পণ্যবাজারবিষয়ক মূল্য নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান আরগাসের রাঘব জেইন বলেন, সীমিত সরবরাহের মধ্যে সালফার কেনার প্রতিযোগিতায় খনি কোম্পানিগুলো এগিয়ে রয়েছে। ধাতুর উচ্চমূল্য থেকে বাড়তি মুনাফা পাওয়ায় এসব কোম্পানির বেশি দামে কাঁচামাল কেনার সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু তুলনামূলক কম মুনাফায় পরিচালিত সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে একই দামে কাঁচামাল কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মোজাইকের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যান্ডি জাং বলেন, বাড়তি উৎপাদন ব্যয় কৃষকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ, কৃষকদের বেশি দামে সার কেনার সামর্থ্য সীমিত। এ অবস্থায় উৎপাদন কমানো ছাড়া বিকল্প উপায় থাকে না।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বজুড়ে ফসলের উৎপাদন কমতে পারে। আর উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ফসফেট রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মরক্কোর ওসিপি গত মাসে সালফারের বাড়তি দাম নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। সালফারের মূল্যবৃদ্ধিতে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও আর্থিক চাপের কারণে সেই ব্যয় পুরোপুরি কৃষকদের ওপর চাপানো সম্ভব হচ্ছে না।
এ পরিস্থিতিতে কম সালফার প্রয়োজন হয়-এমন সার উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল নয়, এমন বিকল্প উৎসও খুঁজছে তারা।
অন্যদিকে, ধাতুর উচ্চমূল্য খনি কোম্পানিগুলোকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। তামার দাম টনপ্রতি প্রায় ১৫ হাজার ডলারের রেকর্ড উচ্চতার কাছাকাছি পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও ভোক্তা ইলেকট্রনিকস পণ্যে তামার ব্যাপক ব্যবহার থাকায় এর চাহিদা বেড়েছে।
চিলির খনি কোম্পানি আন্তোফাগাস্তা জানিয়েছে, সালফিউরিক অ্যাসিড ও ডিজেলের দাম বাড়ায় তাদের ব্যয় বেড়েছে। তা সত্ত্বেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে কোম্পানিটির আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি ছিল।
তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সালফারের বাণিজ্যে বিঘ্ন অব্যাহত রয়েছে। ইরান যুদ্ধ চলতে থাকায় হরমুজ প্রণালিতে এখনো কিছু জাহাজ আটকে রয়েছে। ফলে সালফারের সরবরাহ কখন স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এ সংকট দীর্ঘায়িত হলে খনি ও সার শিল্পের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উৎপাদন কমে গেলে খাদ্য সরবরাহে চাপ তৈরি হবে, যার প্রভাব পড়তে পারে বিশ্ববাজারের খাদ্যপণ্যের দামে। এতে শেষ পর্যন্ত বাড়তি ব্যয়ের বোঝা বহন করতে হতে পারে সাধারণ ভোক্তাদেরও।