ঢাকারবিবার , ২৮ জুন ২০২৬
  1. সর্বশেষ
  2. লাইফস্টাইল

সম্পূর্ণ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ: সাতটি দেশের নিরব বিপ্লব

প্রতিবেদক
Ibrahim Khalil
১৫ জুলাই ২০২৫, ১২:২২ বিকাল

Link Copied!

বৃষ্টিভেজা সকালে, কোস্টারিকার একটি পাহাড়ি গ্রামে ছোট একটি স্কুলের পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে খরস্রোতা নদী। সেই নদীর জলের তোড়ে ঘোরে একটি ছোট টারবাইন, আর সেখান থেকেই বিদ্যুৎ জোগান পাচ্ছে পাশের বিদ্যালয়, কয়েকটি ঘরবাড়ি, এমনকি ছোট্ট এক কারখানাও। এই দৃশ্য আজ আর বিচিত্র নয়—এটি সেই বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে গোটা দেশটি তার বিদ্যুৎ চাহিদার শতভাগ পূরণ করছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে।

এই বাস্তবতা কেবল কোস্টারিকায় সীমাবদ্ধ নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি, জীবাশ্ম জ্বালানির দাম ও সরবরাহ অনিশ্চয়তা, এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসের বৈশ্বিক প্রয়োজনে, কিছু দেশ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে তাদের সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এখন পরিবেশবান্ধব। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, সাতটি দেশ এমন বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেছে, যারা শতভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে—যেখানে নেই কয়লা, তেল কিংবা প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার।

এই দেশগুলোর কাহিনী কেবলমাত্র প্রযুক্তি বা অর্থনীতির নয়, বরং এটি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, স্থানীয় জ্ঞানের ব্যবহার, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতার এক প্রতীক।

১. কোস্টারিকা – সবুজ স্বপ্নের দ্যুতি
লাতিন আমেরিকার এই শান্তিপূর্ণ দেশটি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে বিশ্বনেতা। অনেক বছর ধরেই তারা বছরে ৯৮–৯৯% বিদ্যুৎ উৎপাদন করত জলবিদ্যুৎ, ভূ-তাপীয়, সৌর ও বায়ু শক্তি দিয়ে। কিন্তু ২০২3 সাল থেকে তাদের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ১০০% নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়েছে।

কোস্টারিকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উৎস হলো নদী। পাহাড়ি অঞ্চল থেকে নেমে আসা নদী ও ঝরনা থেকে উৎপন্ন জলবিদ্যুৎ দেশের প্রায় ৬৫% বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। বাকি অংশ আসে জিওথার্মাল ও উইন্ড পাওয়ার থেকে। এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে তারা দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ করেছে অবকাঠামোতে, প্রণোদনা দিয়েছে গ্রীন এনার্জি প্রকল্পে এবং পরিবেশবান্ধব নীতিকে রেখেছে কেন্দ্রবিন্দুতে।

২. আইসল্যান্ড – আগ্নেয়গিরির শক্তিতে উজ্জ্বল
বহু মানুষ জানেন না যে আইসল্যান্ড বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভূ-তাপীয় জ্বালানি ব্যবহারকারী দেশ। এটি একমাত্র দেশ যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের শতভাগ আসে জলবিদ্যুৎ ও ভূ-তাপীয় শক্তি থেকে। তাদের ভূতাত্ত্বিক অবস্থান এই সুবিধা দিয়েছে—আগ্নেয়গিরিতে ভরপুর দেশটিতে পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে উঠে আসা তাপশক্তিকে কাজে লাগিয়ে ঘর গরম, পানি উত্তোলন, এমনকি বিদ্যুৎ উৎপাদনও সম্ভব হয়েছে।

রাজধানী রেইক্যাভিকে একশো শতাংশ বাড়ি গরম করা হয় ভূ-তাপীয় তাপ ব্যবহার করে। দেশের প্রায় ৭৫% বিদ্যুৎ আসে জলবিদ্যুৎ থেকে এবং বাকি অংশ ভূ-তাপীয় উৎস থেকে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার তাদের বিদ্যুৎখাতে একেবারেই নেই।

৩. নরওয়ে – ফিওরডের দেশে জলবিদ্যুৎ বিপ্লব
নরওয়ে ইউরোপের অন্যতম শীতপ্রধান ও পর্বতময় দেশ। এ কারণে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের এক আদর্শ স্থান। আজ দেশটির ৯৯–১০০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় জলবিদ্যুৎ থেকে। বরফে মোড়া পর্বত থেকে গলে আসা পানি আর অসংখ্য জলপ্রপাত দেশটিকে বিশাল জলবিদ্যুৎ সম্ভার দিয়েছে।

নরওয়ে এমনকি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সুইডেন, ডেনমার্ক, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসে রপ্তানিও করে। তারা “গ্রিন সার্টিফিকেট” ও কর ছাড় নীতির মাধ্যমে নবায়নযোগ্য খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করেছে।

৪. আলবানিয়া – অদৃশ্য শক্তির নিরব বিপ্লব
দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের ছোট এই দেশটি অধিকাংশ মানুষই পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধারায় আছে বলে জানেন না। বাস্তব হলো, আলবানিয়ার বিদ্যুৎ খাত ১০০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর, যার প্রায় পুরোটাই আসে জলবিদ্যুৎ থেকে।

আলবানিয়ার নদী, বিশেষত ড্রিন নদী ও এর উপনদীগুলোর ওপর নির্মিত হাইড্রোপাওয়ার প্লান্ট দেশটির প্রায় সব বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। তারা কিছু সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পও হাতে নিয়েছে ভবিষ্যতের জন্য।

৫. ভূটান – সুখী দেশের সবুজ শক্তি
হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত ভূটান শুধুমাত্র তার নাগরিকদের সুখ নিয়ে বিশ্বে পরিচিত নয়, বরং পরিবেশ সুরক্ষা এবং সবুজ জ্বালানির দিক থেকেও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দেশটির বিদ্যুৎ খাত প্রায় ১০০ শতাংশ জলবিদ্যুৎনির্ভর, যা তিব্বতের হিমবাহ থেকে উৎপন্ন হওয়া নদীগুলোর শক্তিকে কাজে লাগায়।

ভূটান কেবল নিজস্ব চাহিদা পূরণ করেই থেমে থাকে না; তারা ভারতে বিশাল পরিমাণ জলবিদ্যুৎ রপ্তানি করে। এভাবে তারা পরিবেশবান্ধব জ্বালানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে।

৬. প্যারাগুয়ে – শক্তির আড়ালে থাকা পরাশক্তি
লাতিন আমেরিকার আরেক বিস্ময় হচ্ছে প্যারাগুয়ে। দেশটি জনসংখ্যার দিক থেকে ছোট হলেও তাদের রয়েছে ইটাইপু জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, যা বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর একটি। এই কেন্দ্র ব্রাজিল ও প্যারাগুয়ে যৌথভাবে পরিচালনা করে।

প্যারাগুয়ে তার বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ১০০ শতাংশ জলবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করে এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ রপ্তানি করে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনায়। নবায়নযোগ্য খাতের এই শক্তি তাদের শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতা দিয়েছে।

৭. লেসোথো – আফ্রিকার ছোট্ট সবুজ রাজ্য
দক্ষিণ আফ্রিকার বুকে জড়িয়ে থাকা লেসোথো আফ্রিকার একটি ক্ষুদ্র পাহাড়ি দেশ, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানির এক দুর্লভ উদাহরণ। এখানকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থার পুরোটা জলবিদ্যুৎ থেকে আসে। দেশটির ‘Lesotho Highlands Water Project’ এ অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে পরিচিত।

আফ্রিকার অন্য দেশের তুলনায় তাদের গ্রিড ছোট, জনসংখ্যা কম, এবং সরকারের আগ্রহ বেশি হওয়ায় লেসোথো নবায়নযোগ্য খাতে এগিয়ে থাকতে পেরেছে।

পরিশেষে: এই সাত দেশের শিক্ষা আমাদের কী বলে?
জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণতা এবং জীবাশ্ম জ্বালানির সীমাবদ্ধতা যখন গোটা পৃথিবীকে এক অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে, তখন এই সাতটি দেশের গল্প এক সাহসী পথনির্দেশ দেয়। তারা প্রমাণ করেছে, শতভাগ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন কোনো অলীক কল্পনা নয়—এটি বাস্তব, সম্ভব এবং কার্যকর।

এই দেশগুলোর একটি বৈশিষ্ট্য সাধারণ: তারা তাদের প্রাকৃতিক সম্পদকে সম্পদ হিসেবে দেখেছে, সমস্যার উৎস হিসেবে নয়। তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করেছে, প্রণোদনা দিয়েছে, জনগণকে সম্পৃক্ত করেছে, এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেখিয়েছে।

যেখানে আজো বিশ্বের ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে আসে, সেখানে এই দেশগুলোর অর্জন যেন ভবিষ্যতের নীলনকশা। একদিন হয়তো আরো অনেক দেশ এই তালিকায় যুক্ত হবে—বাংলাদেশসহ। একদিন হয়তো আমাদেরও শিশুরা একটি হিমবাহ-চালিত গ্রিড থেকে আলো পাবে, মেঘের নিচে দাঁড়িয়ে।

জীবন আর প্রকৃতির এই শান্ত সহাবস্থানে, এই সাত দেশের যাত্রা একটি আলোকবর্তিকা হয়ে আছে—বাকি বিশ্বের জন্য।

Facebook Comments Box

আরও পড়ুন

চীনে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ৭ বাংলাদেশি

চকরিয়ায় মাইক্রোবাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত ২

অতিরিক্ত করলা খেলে হতে পারে ৫ স্বাস্থ্যঝুঁকি

Revolutionary Technology ‘TESOS’ in Biological Tissue Observation

জৈবিক টিস্যু পর্যবেক্ষণে বৈপ্লবিক প্রযুক্তি ‘টিইএসওএস’

পাখিরা কীভাবে পথ চেনে? সমাধান দিল নতুন গবেষণা

দেশজুড়ে বাড়ছে বৃষ্টির প্রবণতা, কয়েক জেলায় তাপপ্রবাহ অব্যাহত

Phoenix Summit 2026 Concludes with Strong Focus on Cybersecurity and Digital Resilience

সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সহনশীলতায় গুরুত্ব দিয়ে শেষ হলো ফিনিক্স সামিট ২০২৬

পিকআপ-সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে মা-মেয়েসহ নিহত ৩

গ্যাস বেলুনে ১৫ মিনিট বন্ধ মেট্রোরেল

ঢাকাসহ ১২ জেলায় দুপুরের মধ্যে ঝড়-বৃষ্টির আভাস